পুরোনো ফ্যাসিবাদ আবার নতুন করে ফিরে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হবে না বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এখন আবারও সেই পুরনো সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে।’
সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কর্তৃক আয়োজিত নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডাকসু ভিপি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সেই রাজনীতি আর ফিরবে না। কিন্তু আমাদের কষ্ট দেয়, আজকে আমরা আবার দেখতে পাচ্ছি, সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদ আবার নতুনভাবে চলে আসছে। ফ্যাসিবাদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নেই। যে-ই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে, তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। জুলাই বিপ্লব থেকে এ শিক্ষাই পাওয়া গেছে।’
ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তনের বিষয়ে সাদিক কায়েম বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি হবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণভিত্তিক, মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক এবং ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ডাকসুসহ পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
ক্যাম্পাসে দখলদারত্বের রাজনীতি ও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির বিরোধিতা করে ডাকসুর ভিপি বলেন, ‘এসব চর্চা আর ফিরতে দেওয়া হবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করে সাদিক কায়েম বলেন, ‘বাংলাদেশের বয়স ৫৫ বছর হলেও গত কয়েক দশকে ক্ষমতায় থাকা অনেক নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতি করার অভিযোগ রয়েছে।’
তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রাহাজানি, সন্ত্রাস ও হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে লোপাটের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের ভূমিকার প্রশংসা করে সাদিক কায়েম বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস জড়িত। জুলাই বিপ্লবে কলেজের সায়েন্স ল্যাব এলাকা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। এ কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজু ভাস্কর্য, শহীদ মিনার ও শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন।’
তিনি বলেন, ‘দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। বর্তমান শিক্ষার্থীরাই আগামীর বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেবেন। সে জন্য তাঁদের মেধা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। উসমান হাদি দেখিয়েছেন কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিতে হয়, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয় এবং ইনসাফের ওপর অটল থাকতে হয়।’
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ‘কোন বিষয়ে বা কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন, সেটিই সাফল্যের একমাত্র নির্ধারক নয়। বরং সময়কে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের জন্য পরিকল্পনা তৈরি, সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি ভাষা শেখার পরামর্শ দেন।
ডাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত একটি চাকরি মেলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘সেখানে ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি অংশ নিয়েছিল এবং ৪০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব চাকরির বেতন ছিল ৬০ হাজার টাকা থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি। গণভোটের জনরায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কার্যকর বিচার না হওয়া, জ্বালানি খাতের সংকট এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দখলদারত্বের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘দখলদারত্বের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকিম আহমেদের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারী সাইমুন ইসলাম সানির সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত সংগঠনটির সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক আনিছুর রহমান আনিছ এবং কেন্দ্রীয় সাবেক কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মারুফ সহ শাখার অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।