ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জেরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে ১০ অক্টোবর বিক্ষোভের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিক্ষোভে সমর্থন জানায় বামপন্থী বিভিন্ন দল ও ছাত্রসংগঠন। তবে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সহআহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা ও মুখপাত্র সৌরভ দাসকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া আন্দোলন ঘিরে বিপুলসংখ্যক কর্মী, শিক্ষার্থী ও অ্যাক্টিভিস্টকে আটক করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে অসংখ্য মুসলিম তরুণ ও শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন।
এর আগে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত উমর খালিদ ও সারজিল ইমামের মতো মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টদের কারাবন্দি থাকা নিয়েও ভারতে বিতর্ক রয়েছে। তবে এবার নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে, আন্দোলনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কয়েকজন মুসলিম আলেমের দেওয়া বক্তব্য ঘিরে। তাঁদের কেউ কেউ বিক্ষোভকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিক্ষোভে যেতে নিষেধ যেসব আলেমের
গত ৯ অক্টোবর অল ইন্ডিয়া ইমাম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. ইমাম উমার আহমেদ ইলিয়াসি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, "আমি একটি আবেদন এবং অনুরোধ জানাচ্ছি। কিছু রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি মানুষকে বিভ্রান্ত করে আমাদের দেশের শান্তি ও সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। দেশের পরিবেশ বিনষ্ট করার জন্য ১০ তারিখ একটি বড় ষড়যন্ত্র চলছে। তাই আমি সমস্ত মুসলমানদের অনুরোধ করছি, কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা বিভ্রান্ত হবেন না এবং এই বিক্ষোভগুলোতে অংশ নেবেন না। আপনারা জানেন যে এই বিক্ষোভের সময় যে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে তাকে গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে এবং জামিন দেওয়া হবে না, আপনারা মারাত্মক বিপদে পড়বেন। আমি সকল ইমামদের আজ তাঁদের মসজিদ থেকে ঘোষণা দেওয়ার এবং সমস্ত মুসলমানদের যেকোনো ধরনের বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।"
বিজেপিপন্থী বিভিন্ন পেজে ড. ইমামকে ‘রাষ্ট্রবাদী মুসলিম’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমাতে তাঁর বক্তব্যের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। দেখুন এখানে এখানে এখানে
নিজ বক্তব্যের সমালোচনার জবাবে ড. ইমাম একটি সাক্ষাৎকারে আবারও বলেন, 'মোদি মুসলিমদের জন্য যা করেছে অন্য কোন সরকার করেনি। মুসলিমরা জ্ঞানহীন বলেই বিজেপিকে সমর্থন করছে না।'
মুসলিম যুবকদের দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সুন্নি মুসলিমদের সংগঠন সর্বভারতীয় মুসলিম জামায়াতের সভাপতি মাওলানা মুফতি শাহাবুদ্দিন রেজভি। তিনি বলেন, “সমাবেশ করা প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার; এটি আমাদের আইনগত অধিকার। তবে কাউকে সহিংসতায় জড়ানোর অনুমতি দেওয়া যায় না। আমি দিল্লিতে বসবাসকারী এবং উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলার সব মুসলিম যুবকের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, তারা যেন দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আসন্ন অবস্থান কর্মসূচি থেকে দূরে থাকেন এবং কোনো অবস্থাতেই এতে অংশগ্রহণ না করেন। কারণ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।”
মুফতি শাহাবুদ্দিন রেজভী পূর্বে ধর্মেন্দ্র প্রদানের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনেও মোদির পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী গালি নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে গালিগালাজ করবেন না। বিজেপিকে পরাজিত করা শুধু মুসলিমদের একার দায়িত্ব নয়।’
এদিকে, মসজিদের মাইক থেকে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে মুসলিমদের তাতে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানোর একটি ভিডিও ভারতীয় বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ইমামকে বলতে শোনা যায়, ককরোচদের আন্দোলন অবৈধ এবং কোনো মুসলিম সন্তানের এই আন্দোলনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে এ ধরনের বক্তব্য প্রচারে ইমামদের ওপর বিজেপি সরকারের চাপ রয়েছে।
আসাদুদ্দিন ওয়েসি ও এআইএমআইএমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ভারতের বৃহৎ মুসলিম রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দলটির সভাপতি আসাদুদ্দিন ওয়েসির ভূমিকা নিয়ে সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম ভোটারদের বাদ দেওয়া ও ভোট কারচুপির অভিযোগে বিজেপিবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন করলেও এআইএমআইএমকে একই মাত্রায় সরব হতে দেখা যাচ্ছে না। ওয়েসি বিভিন্ন সমাবেশে বিজেপির সমালোচনার পরিবর্তে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সমালোচনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণে কেউ কেউ এআইএমআইএমকে বিজেপির ‘বি টিম’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
ভারতীয় আইনজীবী মুখতার শাহবাজ আলম এক পোস্টে লিখেন, ‘প্রায় প্রত্যেক দল আন্দোলন করছে, শুধুমাত্র ওয়েসি ছাড়া। মুসলিম ডানপন্থী দল হিন্দু ডানপন্থী দল (বিজেপি) কে রক্ষা করছে। ভাতৃত্ববোধ সেরা।’
আসাদুদ্দিন ওয়েসির বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
আলেমদের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করছেন মুসলিম তরুণরা
আন্দোলনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো কয়েকজন আলেমের অবস্থানকে হাস্যকর ও টিটকারি হিসেবে দেখছেন মুসলিম তরুণদের একাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের কেউ কেউ এসব আলেমকে ‘বিক্রি হওয়া হুজুর’ ও ‘বিজেপির দালাল’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। পাশাপাশি, মুসলিম তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন সিজেপির সঙ্গে সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে।
দ্য ট্রুথ ২০৪৭ নামের একজন মুসলিম ব্লগার বলেন, "কিছু মাওলানা সিজেপির প্রোটেস্টে না যাওয়ার ফরমান জারি করেছে। ব্রিটিশ আমলেও কিছু মাওলানা ব্রিটিশদের টাকা খেয়ে মুসলিমদের সকল আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে বলতো। কিন্তু তখনও অনেক মুসলিম দেশের জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছে, এখনও করবে। আর তোমাদের মতো কিছু আলেম তখনও শাসকের গোলামী করতো, এখনো গোলামী করছে।"
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী হিন্দের ছাত্রসংগঠন স্টুডেন্ট ইসলামিক অর্গানাইজেশন অব ইন্ডিয়াকেও যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি তাশরিফ কেপি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর দিল্লি পুলিশের হাতে আটক হন বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নিয়ে সংগঠনটির আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানা যায়।