ফিলিস্তিনের আইনসভা নির্বাচন আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ও আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নির্বাচন পেছানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) আব্বাস এ বিষয়ে একটি ডিক্রি জারি করেন। ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ডিক্রিতে ‘ইসরায়েলের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট বাধা’ এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
তবে আব্বাসের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। আব্বাসের বক্তব্যকে তিনি দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়ানোর উদ্দেশ্যে বলা ‘আরেকটি হাস্যকর মিথ্যা’ বলে আখ্যা দেন।
আগামী মাসে ফিলিস্তিনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই সংশয় ছিল। ২০০৫-০৬ সালের পর ফিলিস্তিনে আর কোনো প্রেসিডেন্ট বা আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই সময়ের পর আব্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং আব্বাসের অনুগতদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আব্বাসের মেয়াদ শেষ হলেও এরপর থেকে তিনি ডিক্রির মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করে আসছেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীর এবং গাজার মধ্যাঞ্চলীয় দেইর আল-বালাহ শহরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করেছিল। গাজা উপত্যকার একমাত্র শহর হিসেবে দেইর আল-বালাহ ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০০৬ সালের পর গাজায় সেটিই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচন।
আব্বাসের জারি করা ডিক্রিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের সামরিক হামলা, বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের প্রাপ্য করের রাজস্ব আটকে রাখাকেও নির্বাচন পেছানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজা উপত্যকার ক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি’, ইসরায়েলি সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া, পুনর্গঠনে অগ্রগতি না থাকা এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ডিক্রিতে জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমে নির্বাচন কমিশনের কর্মী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল এবং পরে অঞ্চলটি নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করে। তবে অধিকাংশ দেশ ইসরায়েলের এই সংযুক্তিকরণকে স্বীকৃতি দেয় না। সাধারণত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে নির্বাচন আয়োজনের অনুমতি দেয় না ইসরায়েল।
ফিলিস্তিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার পর নির্বাচন পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ঐক্য জোরদার এবং নির্বাচন আয়োজনের প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবিলায় একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সংলাপের জন্য সময় রাখার কথাও বলা হয়েছে।
দুই দশক পর নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি
বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দুই ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানান, আব্বাসের দল ফাতাহ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হামাসের নেতারা বুধবার কায়রোতে এক বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন।
পশ্চিম তীরভিত্তিক প্যালেস্টাইনিয়ান সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের (পিএসআর) আগস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, ফাতাহ ও হামাস—উভয় দলের প্রতিই জনসমর্থন কমেছে। গাজা ও পশ্চিম তীরের অনেক ফিলিস্তিনি চলমান রাজনৈতিক বিভাজনের জন্য দল দুটিকে দায়ী করেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে আব্বাস আগামী নভেম্বরেই নির্বাচনের সময়সূচি বহাল রাখার কথা জানিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবেই তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আব্বাস ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে লিখিতভাবে প্রেসিডেন্ট ও আইনসভা নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ফিলিস্তিনে নির্বাচন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে দেশটি।
সূত্র : রয়টার্স