Image description

অফিসপাড়ায় চায়ের একটা টং দোকান। অফিসে ঢোকার আগে একটু দাঁড়ানো হয়েছিল চা পানের জন্য। তৈরি চা তখনও হাতে আসেনি। তার আগে কানে ভেসে আসছিল ওই দোকানে জমায়েত নানা মানুষের নানা কথা। কেউ অফিসের কারও নামে খিস্তি করছিলেন, কেউ গসিপ। আবার কেউ আলাপ করছিলেন নিজেদের যাপিত জীবনের নানা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। ওই যেমনটা আমরা বন্ধু, স্বজন পেলে খানিকটা করি আর কি!

তেমনই এক আলাপ কানে এল। দুই ব্যক্তি, পেশায় মনে হলো গাড়িচালক, তারা কথা বলছিলেন সিএনজিচালিত গাড়ির গ্যাস কেনা নিয়ে। একজন বলছিলেন, “তেলের, গ্যাসের দাম বাড়াইল গত কয় মাসে কয়েকবার। আবার গ্যাস পাওয়াও যায় না। দাম বাড়ানোর আগে পাওয়া যায় না, তাও মানলাম। এহন দাম বাড়াইছে, তাও পাওয়া যায় না গিয়া। সারা সকাল ডিউটি করি। আবার রাইতে গিয়া গ্যাস নেওয়ার ডিউটি করি। এমনেই চলে জীবন। কুত্তার জীবন শালার…।”

এরপর অপরজন শুরু করে দিলেন তার দুঃখের গল্প। বলতে থাকলেন, “তেল নিয়া সমস্যা, গ্যাস নিয়া সমস্যা। এহন তো জিনিসপত্রের দামও বাড়ব। ওইডা নিয়াও সমস্যা। সংসারে তো গ্যাঞ্জাম লাইগা যাইব…ওইখানেও সমস্যা…।”

কিন্তু সমস্যার কথা ওই ব্যক্তি আর বলে শেষ করতে পারলেন। তার আগেই মুখোমুখি থাকা অপরজন কথা কেড়ে নিলেন যেন। বলে উঠলেন, “আরে মিয়া, সমস্যার কথা কও…আমরা যে এই দেশের নাগরিক, এইটাও আমাদের আরেকটা সমস্যা।”

শেষের কথাটা কানে লাগল বেশ। কানে বাড়ি খাওয়ার মতোই কথাটা। নিজেকে নাগরিক মনে করা যেকোনো ব্যক্তি যখন তার সতীর্থ কোনো নাগরিকের স্বগতোক্তিতে এমনটা শোনেন, তখন নিজের ভাবনার জগৎটা নড়ে না গিয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু নিজের নাগরিক হওয়াটাকেই কেন ‘সমস্যা’ বলে মনে করছেন ওই ব্যক্তি?

এই ধরনের প্রশ্ন ওঠার বা নাগরিক হওয়ার বিষয়টিকে সমস্যা মনে হওয়ার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কিছু কারণও কাজ করছে। ওই দুই গাড়িচালকের উত্থাপিত তেল, গ্যাস নিয়েই শুরু করা যাক। সম্প্রতি মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ফের সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। একলাফে লিটারে দাম বেড়েছে ২০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর গত ১৮ এপ্রিল তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ায় সরকার। সব মিলিয়ে সরকারের সাত মাসে সব জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি বাড়ল প্রায় ৪০ টাকা। স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও বেশি কঠিন করে তুলছে। অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা এমনটাই মনে করছেন। কারণ, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের ওপরই বেশি পড়বে। বিভিন্ন যানবাহনের ভাড়া, পরিবহনের ব্যয় থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি–সবকিছুই এই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলাফল হিসেবে দেখা দেবে। কিছু কিছু এরই মধ্যে দেখা দিয়েছেও। ফলে এতে জীবনযাত্রার সার্বিক খরচ বেড়েও যাবে। আমাদের দেশে যেহেতু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত–এই দুই শ্রেণির মানুষই সিংহভাগ, তাই প্রভাবটি আরও বেশি অনুভূত হবে। এবং সেই অনুভূতি যে তীব্র হয়ে উঠছে, তা নিশ্চয়ই ওপরের ঘটনাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আমরা যে এই দেশের নাগরিক, এইটাও আমাদের আরেকটা সমস্যা’! এ সময় ক্ষোভ আসলে কোনো যুক্তি মানতে চায় না। কোনো প্রবোধ শুনতেও চায় না। কেবলই টগবগ করে ফুটতে থাকে জীবন যাপনের যত বাধা, বিপত্তি। এটি প্রশমনের একমাত্র উপায় হলো, সাধারণ নাগরিকের ‘নাগরিক’ মর্যাদাটিকে আরও বাড়ানো

ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। ক্ষোভও বাড়ছে। এসবে আরও উসকানি দিচ্ছে হাম ও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্ত‌রের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩০০ ছুঁই ছুঁই। গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত হামের উপসর্গে দেশে ১ হাজার ৪০ শিশুর মৃত্যুর হয়েছে। আক্রান্তের মোট সংখ্যা উল্লেখ করে আর ভারাক্রান্ত হতে মন চাইছে না। শুধু এতটুকুই বলা যে, ডেঙ্গু ও হামের এই প্রাদুর্ভাব আক্রান্ত মানুষের জীবনে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি নানা ধরনের আর্থিক চাপও তৈরি করছে। হাসপাতালে ভর্তি, যাতায়াত, রোগীর দেখাশোনা এবং অসুস্থতার কারণে কাজ করতে না পারায় পরিবারের ওপর বাড়তি খরচ ও আয় হারানোর চাপ পড়ছে। অর্থাৎ, হাম ও ডেঙ্গু সাধারণ মানুষের জীবন যেমন কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি করে দিচ্ছে নিঃস্ব। অথচ, এই দুটি রোগই প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু এতে প্রাণ ও অর্থহানির সেই অসহায় অবস্থায় মানুষ সেভাবে সরকারি সমর্থনকে পাশে পাচ্ছে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ আর কোথায় যাবে এমন অসহায় পরিস্থিতিতে?

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (‎বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় না বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। অর্থাৎ, আর্থিক চাপ আছে ভালোমতোই। আর বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলেছে, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে চরম চাপে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। কাঠামোগত এই জটিলতার প্রভাব অব্যাহত থাকলে চলতি ২০২৬-২৭ ও আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চরম ঘাটতি, মূলধনী বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানি আয়ের শ্লথগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে অর্থনীতি গতি হারিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার সরাসরি আঘাত এসেছে জীবনযাত্রার মানের ওপর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ অতিরিক্ত মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। হ্যাঁ, বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরেই যে অবস্থা সুবিধার না, তা মোটামুটি স্পষ্ট।

 

তো, এমন চাপে, তাপে সাধারণ মানুষের যে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা, সেটি বলাই যায়। এমন পরিস্থিতিতে আসলে মনের অবস্থাও ভালো থাকে না। ফলে একটু, আধটু ‘নেগেটিভ’ জিনিসেই মনে নানা ‘নেগেটিভ’ ভাবনা চলে আসে। যেমন: হুট করেই জানা গেল দেশের ৩০টির মতো ব্যাংকে নাকি ৫/৬ দিন কোনো ডিজিটাল লেনদেন করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো কেবল এসএমএস দিয়েই খালাস। ওদিকে লাখ লাখ গ্রাহকেরা পড়েছে ভোগান্তিতে। সংবাদমাধ্যমের দেওয়া খবর অনুযায়ী, আইটি কনসালট্যান্টসের (আইটিসি) নেটওয়ার্কভিত্তিক পেমেন্ট সুইচ ‘কিউ-ক্যাশ’-এর সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের গ্রাহকেরা ডিজিটাল লেনদেনে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে আইটি কনসালট্যান্টস (আইটিসি) পরিচালিত কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের কার্ড, এটিএম ও এনপিএসবি সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লেনদেন সেবায় বিঘ্ন ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকেরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। অনুতাপের বিষয় হলো, গ্রাহকেরা জানার পর বিষয়টি জানতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। হ্যাঁ, বাংলাদেশ ব্যাংক পরে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে বটে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা অনেকটা কর্তৃপক্ষের ‘ইচ্ছামাফিক’ হয়ে গেল নাকি? মানে, সেখানে গ্রাহকদের সেবা পাওয়ার অধিকারসহ ব্যাংকখাতের সার্বিক দায়িত্বশীলতা নিয়েই কি প্রশ্ন উঠে যায় না?

যায়। এটি তো একটি ঘটনা। এর পাশাপাশি আরও অনেক ঘটনার উল্লেখও করা যায়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে কর হারের চাপ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া–সবই আসলে সাধারণ মানুষদের কাছে ‘বোঝা’ হিসেবে অনুভূত হয়। সেই সাথে নানাবিধ চাপে থাকা সাধারণ মানুষের মনে আরেকটি অনুভূতির জন্ম হয়। সেটি অনেকটা এ রকম–‘আমি যে নাগরিক, আমাকে তো কেউ গোণেই না!’ আগেই বলেছি, চাপে-তাপে অনেক কিছুরই অর্থ মনের ভেতরে অন্য আকার নিয়ে ফেলে। মন তখন আর ‘ক্ষমাশীল’ হতে চায় না। চায় না ‘মানিয়ে’ নিতে। বরং উল্টোটা হয় বেশি।

 

আর ঠিক এমন অবস্থাতেই প্রশ্ন উঠে যায় যে, ‘…আমরা যে এই দেশের নাগরিক, এইটাও আমাদের আরেকটা সমস্যা’! এ সময় ক্ষোভ আসলে কোনো যুক্তি মানতে চায় না। কোনো প্রবোধ শুনতেও চায় না। কেবলই টগবগ করে ফুটতে থাকে জীবন যাপনের যত বাধা, বিপত্তি। এটি প্রশমনের একমাত্র উপায় হলো, সাধারণ নাগরিকের ‘নাগরিক’ মর্যাদাটিকে আরও বাড়ানো। তাদের যে মূল্য আছে সরকারের কাছে, সেটি অনুভূত করার বিষয়। একইসাথে সরকার যে সাধারণ মানুষের কষ্ট বোঝে, পাশে দাঁড়াতে চায়, সেটিও বোঝাতে হয় উত্তমরূপে। তা না হলে ‘অসন্তোষ’ আসলে কমে না, বরং অমোচনীয় কালির মতোই হয়ে ওঠে ক্রমে।

 

পুরো বিষয়টা এখন সরকারপক্ষীয় কর্তৃপক্ষ বুঝলেই ভালো। কারণ তাতেই দেশ ও সমাজের মঙ্গল, মানুষের ভালো। নইলে যে অস্থিরতা টিকে থাকাই ভবিতব্য হয়ে উঠবে।

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা