Image description

দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন। বাকি ৯২ শতাংশ রয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসার আওতার বাইরে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো রাজধানী ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, দক্ষ জনবল ও ওষুধের সংকট। ফলে মানসিক রোগের চিকিৎসায় দেশে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

এমনই প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের সঙ্গে দেশে আজ ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য-‘জীবনের অভিজ্ঞতার কণ্ঠস্বর শুনি : সত্যিকারের কণ্ঠ, সত্যিকারের পরিবর্তন।’ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য শুধু রোগমুক্ত থাকার বিষয় নয়। আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিকূলতা মোকাবিলা এবং সামাজিক জীবনে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতাও এর অংশ। অথচ পারিবারিক টানাপোড়েন, কাজের চাপ, বেকারত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার মতো বিষয় মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উদ্বেগজনিত রোগের হার ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বিষণ্নতায় ভুগছেন ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া সোমাটিক সিমটম ডিজঅর্ডার, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি), বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া ও মাদকাসক্তির মতো সমস্যাও রয়েছে।

শিশু-কিশোরদের মধ্যেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ বয়সের ৫ দশমিক ১ শতাংশের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং ৪ দশমিক ৭ শতাংশের উদ্বেগজনিত সমস্যা রয়েছে। কনডাক্ট ডিজঅর্ডারের হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের মধ্যে মাদক গ্রহণের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ৭ থেকে ১১ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এ হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।

মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ : টেলি-সাইকিয়াট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক লিমিটেডের (টিআরআইএন) মনোবিজ্ঞানী আবিদা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, বেশ কিছু কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। জৈবিক কারণের মধ্যে বংশগত বা জিনগত প্রভাব, মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্যের অভাব (যেমন-সেরোটোনিন বা ডোপামিনের ঘাটতি), মস্তিষ্কে আঘাত, স্নায়বিক সমস্যা বা সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা (যেমন-ডায়াবেটিস, ক্যানসার)। মনস্তাত্ত্বিক কারণের ক্ষেত্রে শৈশবে অবহেলা, নির্যাতন বা ট্রমা, পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ বা একাকিত্ব আত্মবিশ্বাসের অভাব ও অতিরিক্ত উদ্বেগ, নেতিবাচক চিন্তা, অপরাধবোধ বা আত্মঅবমূল্যায়ন। সামাজিক কারণের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, বেকারত্ব বা আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বন্ধু বা পরিবারের সমর্থনের অভাব, বৈষম্য, বুলিং বা সামাজিক চাপ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল আসক্তি, অনিয়মিত জীবনধারা ইত্যাদি।

মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ : টিআরআইএনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তানজির রশিদ সরণ যুগান্তরকে বলেন, একজন ব্যক্তির মানসিক অসুস্থতার বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ হলো-দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ, হতাশা বা নিরাশা, অতিরিক্ত ঘুমানো বা অনিদ্রা, খাওয়ার রুচি ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও অতিরিক্ত আত্মসমালোচনা। অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা, কানে গায়েবি শব্দ শোনা, তীব্র বিষণ্নতা, অতিরিক্ত অর্থ খরচ করা, হীনম্মন্যতায় ভোগা, একই কাজ বারবার করা, অতিরিক্ত উৎফুল্লতা, রাগ, ভয়, উদ্বেগ বা অস্থিরতা। একা থাকতে চাওয়া ও সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। নিজের ক্ষতি করার চিন্তা বা প্রবণতা কাজ করা। পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারানো। মেজাজের অস্বাভাবিক ও ঘন ঘন পরিবর্তন, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তি, নিজেকে মূল্যহীন বা অযোগ্য মনে হওয়া। অতিরিক্ত অপরাধবোধ, লজ্জা বা অনুশোচনা, অল্পতেই বিরক্তি ও ধৈর্য হারিয়ে ফেলা। পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, দৈনন্দিন জীবনযাপন ও স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন। আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হওয়া, অতীতের ঘটনা নিয়ে বারবার নেতিবাচক চিন্তা করা, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিরিক্ত ভয়, অনিশ্চয়তা বা নেতিবাচক ধারণা ইত্যাদি।

চিকিৎসায় বড় ঘাটতি : মানসিক রোগের ব্যাপকতার তুলনায় দেশে সেবাদাতা বিশেষজ্ঞ খুবই সীমিত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন প্রায় ৩৮০ জন। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক ১৯ জন। মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন প্রায় ৬০০ জন। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে এ সংখ্যা শূন্য দশমিক ৩০ জন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত মনোরোগবিষয়ক সমাজকর্মী রয়েছেন মাত্র ১০ জন।

অন্যদিকে, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ চিকিৎসক রয়েছেন ২১ হাজার ২৬৭ জন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী ৯ হাজার ৪০০ জন। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স রয়েছেন ২৮ হাজার ১৬৫ জন। তবে প্রশিক্ষিত জনবল থাকলেই পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত হয় না। তাদের যথাযথ কাজে লাগানো, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করাও জরুরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাবনা মানসিক হাসপাতালে শয্যা ৫০০টি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৪০০ শয্যা রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে ৪০টি এবং বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে প্রায় ১৫০টি শয্যা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সেখানে আন্তঃবিভাগে পাঁচ হাজার ১০৩ জন, বহির্বিভাগে ৭৬ হাজার ৮৩০ জন এবং জরুরি বিভাগে সাত হাজার ২৩২ জন সেবা নিয়েছেন। টেলিসাইকিয়াট্রিক সেবা নিয়েছেন ৪৮৪ জন। বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার এই চিত্র বিশেষায়িত সেবার ওপর চাপের বিষয়টিও সামনে আনে।

জেলা-উপজেলায় সেবা সম্প্রসারণ জরুরি : সংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে বলেছেন, রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজে পৃথক মনোরোগবিদ্যা বিভাগ চালু এবং সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতাও বাড়াতে হবে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান রয়েল যুগান্তরকে বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই একটা বিষয়। সাধারণত জেনেটিক কারণ, মস্তিষ্কের গঠন ও রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা, বিভিন্ন হরমোনাল ও বিপাকজনিত সমস্যার পাশাপাশি পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যার কারণে মানুষ বিভিন্ন বয়সে মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। রোগীদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা যদি আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি তাহলে সার্বিকভাবে মানসিক রোগীর ব্যাপারে ধারণা পরিবর্তন করতে সহায়ক হবে। রোগী এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত পরিবারের সদস্য, তাদের চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত চিকিৎসক ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতাকে আমলে নিয়ে যদি সেগুলো মানসিক স্বাস্থ্যনীতিতে প্রতিফলিত হয় তবেই হয়তো সত্যিকারের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।