Image description

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ সীমিত করতে মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি ও প্রযুক্তিখাতের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। একই সঙ্গে হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ দেশটির শীর্ষ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে সরকার।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার নেওয়া এই দুই পদক্ষেপে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিশ্চিতের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, অভিবাসনব্যবস্থায় জালিয়াতি বন্ধ এবং মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী শ্রম অনুমোদন বা ‘পার্ম’ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট।

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে অধিকাংশ গ্রিন কার্ড পেতে এই অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়ায় নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ করতে হয়, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ বা মজুরির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দম্পরতিদের সন্তান জন্মদান ও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভের পথ সংকুচিত করা, গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ বন্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি কর্মী ও স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ঘোষিত এই পদক্ষেপকে অভিবাসন কর্মসূচির বিরুদ্ধে তার প্রশাসনের এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের প্রচলিত একটি পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধা ও শ্রম দেওয়া শিক্ষার্থীরাও কঠোর সরকারি নজরদারির মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মাইক্রোসফটের চেয়ে বেশি এই ব্যবস্থার (গ্রিন কার্ড পাওয়ার মনোনয়ন) অপব্যবহার আর কোনো প্রতিষ্ঠান করেনি।’

ভ্যান্সের দাবি, গত বছর মাইক্রোসফট ছয় হাজার মার্কিন কর্মী ছাঁটাই করেছে। অথচ একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য ছয় হাজার ৩০০টি এইচ-ওয়ান বি ভিসা (অস্থায়ী কর্মভিসা) এবং প্রায় তিন হাজার গ্রিন কার্ডের সুবিধা পেয়েছে।

তার এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলাসহ প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন বিলিয়নিয়ারকে সম্মাননা দেন ট্রাম্প।

নাদেলাও একসময় এইচ-ওয়ান বি ভিসাধারী ছিলেন। একই ধরনের ভিসা ছিল সম্মাননাপ্রাপ্ত আরেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও স্পেসএক্সের মালিক ইলন মাস্কেরও। এ ছাড়া সম্মাননা পাওয়া অন্য তিন প্রধান নির্বাহীও অভিবাসী।

এদিকে মাইক্রোসফট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সবশেষ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির জমা দেওয়া এইচ-ওয়ান বি ভিসার আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল বিদ্যমান কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো কিংবা তাঁদের অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থান পরিবর্তনের জন্য। নতুন কর্মী নিয়োগের উদ্দেশ্যে এসব আবেদন করা হয়নি।

গত জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি চার হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। এটি ছিল মাইক্রোসফটের বিশ্বব্যাপী মোট কর্মীর প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ।

মার্কিন শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং জানিয়েছেন, স্থায়ী শ্রম অনুমোদনের ওপর নিষেধাজ্ঞার আওতায় মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির পাশাপাশি আরও ছয়টি বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো- কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো, এইচসিএল টেকনোলজিস ও ক্যাপজেমিনি।

সন্ডারলিং বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী শ্রম অনুমোদনের কোনো নতুন আবেদন আমরা গ্রহণ করব না। আগে জমা পড়া কোনো আবেদনও প্রক্রিয়াকরণ করা হবে না।’

শ্রমমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-ওয়ান বি ভিসার অনুমোদন এবং এক লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম অনুমোদন পেয়েছে।

মার্কিন অভিবাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে অনুমোদিত এইচ-ওয়ান বি ভিসাধারীদের সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা ছিল অ্যামাজন ডটকম। এর পরের অবস্থানে ছিল যথাক্রমে টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, অ্যাপল ও মাইক্রোসফট।

ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স জানিয়েছেন, ‘যত দিন প্রয়োজন থাকবে, তত দিন এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।’ তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন চায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনুক।

ভ্যান্স অভিযোগ করেন, কিছু প্রতিষ্ঠান এমনভাবে চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে, যাতে যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরে তারা পর্যাপ্ত আবেদনকারী না পাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে।

অবশ্য মাইক্রোসফট এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, একই ধরনের কাজের জন্য মার্কিন অন্য কর্মীরা যে বেতন পান, প্রতিষ্ঠানটির এইচ-ওয়ান বি ভিসাধারী কর্মীদেরও সমপরিমাণ বেতন দেওয়া হয়।

অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, এইচসিএল টেকনোলজিস, উইপ্রো ও ক্যাপজেমিনির কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন শ্রম বিভাগ ‘প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল’ নামে একটি বিশেষ নজরদারি ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম শুরু করে।

একই সময়ে হোয়াইট হাউস বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য নতুন এইচ-ওয়ান বি ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে এককালীন এক লাখ ডলার ফি আরোপের ঘোষণা দেয়।

ট্রাম্প প্রশাসন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে আসা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও অভিবাসন প্রক্রিয়া কঠিন করেছে।

ভ্যান্স জানান, এসব কর্মসূচির আওতায় পাওয়া ভিসার অপব্যবহার করে মার্কিন কর্মীদের মজুরি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে হার্ভার্ড, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড, ব্রাউন এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি।

 

তিনি বলেন, বিদেশি প্রভাব, অনৈতিক আর্থিক সম্পর্ক কিংবা ভিসার অপব্যবহারের কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

মার্কিন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনের সহসভাপতি সারাহ স্প্রেইৎজার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করছেন। তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এলে মার্কিন অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।’