ডিজিটাল প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার দাবি করেছে একটি সাইবার অপরাধী চক্র। চুরি করা তথ্য প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৪ লাখ মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছে তারা। তবে অপরাধী চক্রের করা তথ্য চুরির পুরো দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দাবি অনুযায়ী, হাতিয়ে নেওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারীদের মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছবি, বাসার ঠিকানা, অবস্থান এবং ফেসবুক পরিচিতি। এ ছাড়া পাঠাওয়ের কর্মী, ব্যবসায়ী ও চালকদের বিভিন্ন তথ্যও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছে চক্রটি।
সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ডেইলি ডার্ক ওয়েব বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এ তথ্য প্রকাশ করে। একই সঙ্গে ডার্ক ওয়েবে অপরাধী চক্রের দেওয়া পোস্টের একটি স্ক্রিনশটও প্রকাশ করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার লিখিত বিবৃতিতে পাঠাও জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের নাম, ই-মেইল ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ কিছু ব্যক্তিগত তথ্য দুর্বৃত্তদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি তারা জানতে পেরেছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাটি শনাক্ত হওয়ার পরপরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইরের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
পাঠাওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর তাদের প্ল্যাটফর্মে সাময়িকভাবে সেবা বিঘ্নিত হয়। ওই দিন সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষা ও প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিস্টেম সাময়িকভাবে অফলাইনে নেওয়া হয়।
পরে দ্রুত সেবাগুলো পুনরায় চালু করা হয়। তবে সিস্টেম পুরোপুরি স্থিতিশীল করার কাজ চলমান থাকায় ব্যবহারকারীরা সাময়িকভাবে কিছু কারিগরি সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে বুধবার পাঠাওয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতেও সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার বিষয়টি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিস্টেম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হয়েছিল। একই সঙ্গে কিছু ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য দুর্বৃত্তদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথাও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
১৩৩ গিগাবাইট তথ্য থাকার দাবি
ডার্ক ওয়েবে প্রকাশিত পোস্টে সাইবার অপরাধী চক্রটি দাবি করেছে, তাদের কাছে পাঠাওয়ের প্রায় ১৩৩ গিগাবাইট তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি রেকর্ড এবং ৫৯১টি তথ্যভান্ডার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে তারা।
চক্রটির দাবি, সবচেয়ে বড় তথ্যভান্ডারে ১ কোটি ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৮টি হিসাবের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি এনআইডি নম্বর ও মুঠোফোন নম্বর, সমপরিমাণ ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য এবং প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর ছবি তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ৫৭ লাখ বাসার ঠিকানা হাতিয়ে নেওয়ার দাবিও করেছে চক্রটি।
শুধু ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য নয়, পাঠাওয়ের অভ্যন্তরীণ ও ব্যবসায়িক তথ্যও নিজেদের কাছে থাকার দাবি করেছে তারা। এসব তথ্যের মধ্যে কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য, প্রশাসনিক প্রবেশাধিকারের নথি, ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব ও ব্যাংক শাখার শনাক্তকরণ নম্বর, অর্থ লেনদেনের তথ্য, পণ্য সরবরাহের অবস্থান এবং চালকদের যাত্রাসংক্রান্ত নথি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য প্রকাশের হুমকি
ডার্ক ওয়েবে দেওয়া পোস্টে পাঠাওয়ের কাছে ৪ লাখ মার্কিন ডলার দাবি করেছে অপরাধী চক্রটি। নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ না করলে এনআইডি, ব্যাংক, কর্মী ও প্রশাসনিক তথ্য প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তারা।
তবে অপরাধী চক্রটির দাবি করা তথ্যের পরিমাণ, তথ্যভান্ডারের সংখ্যা এবং সব ধরনের সংবেদনশীল তথ্য তাদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। পাঠাওয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বিবৃতিতে ব্যবহারকারীদের নাম, ই-মেইল ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ কিছু তথ্যের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাধীন তদন্তের পরামর্শ
এ ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচিত দ্রুত একটি স্বাধীন ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক সার্ভার, অ্যাকসেস লগসহ সব ধরনের ডিজিটাল আলামত সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল আলামতের সুরক্ষা, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং প্রমাণভিত্তিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।