প্রেমের বিয়ে। ১৪ মাসের সংসার। বাড়িতে না জানিয়ে স্ত্রী’কে নিয়ে থাকতেন ভাড়া বাসায়। একপর্যায়ে শুরু হয় নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন। তবুও স্বামীকে ছাড়েননি কাজল (২১)। গত ১৪ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ফোনে ‘নামতেছি’ বলে ভাড়া বাসা থেকে বের হন তিনি। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ২৬ দিন পেরিয়ে গেলেও কাজলের খোঁজ মেলেনি। এ ঘটনায় তার স্বামী মো. আবু কাওসার (২২) ১৭ই সেপ্টেম্বর পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন থেকে তার মোবাইল নম্বর বন্ধ। বাসায় তালা ঝোলানো। পরে কাজলের মা মোছা. মনি থানায় জামাতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
কাজলের বাবার বাড়ি ৬০ ফিট এলাকার বারেক মোল্লা মোড়ে। আর কাওসারের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণা সদর উপজেলায়। বিয়ের পর দু’জনে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, বাবা-মা’য়ের একমাত্র মেয়ে কাজল। গার্মেন্টসে কাজ করতেন। সেখানেই পরিচয়। প্রায় ১৪ মাস আগে প্রেম করে আবু কাওসারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর শুরু হয় নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন। বিষয়গুলো অনেকবার পরিবারকে জানাতো কাজল। পরিবারের সদস্যরা মেয়েকে বুঝিয়ে স্বামীর সঙ্গে সংসার করার কথা বলেন। কাজলও বদলে যাওয়ার আশায় সংসার করতো। এরপরও কাওসারের অত্যাচার কমেনি। খাওয়া খরচ ঠিকমতো দিতো না। বাসা ভাড়া দিতো না। তার বাবা-মা কয়েক মাসের বাসা ভাড়া পর্যন্ত দিয়েছে। এ ছাড়াও বিয়ের বিষয়টি পরিবারের কাছে লুকায় কাওসার।
বাড়িতে জানাতে বললে, এই বলছি, বলবো বলে এড়িয়ে যেতো। কাজল নিখোঁজ হওয়ার দিন ১৪ই সেপ্টেম্বর বাবার বাড়িতে আসে। যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘কাওসার আমারে ঘর দেখতে লইয়া যাইবো সন্ধ্যার সময়’। এই কথা বলেই চলে যায়। এরপর পরিবারের সঙ্গে আর কথা হয়নি। পাশের বাসার মহিলারা জানায়, মোবাইল ফোনে ‘নামতেছি’ বলতে বলতে বের হয় কাজল। এর দু’দিন পর কাওসার কাজলের বাবাকে ফোন করে জানান, তার মেয়ে নাকি বাবার বাড়িতে গেছে। দু’দিন থেকে বাসায় নেই। এরপর ১৭ই সেপ্টেম্বর কাওসারকে নিয়ে পল্লবী থানায় জিডি করেন কাজলের মা মনি। পরদিন থেকে কাওসারের মোবাইল নম্বর বন্ধ। বাসায় তালা ঝোলানো। পরে কাজলের মা মোছা. মনি থানায় কাওসারসহ আব্দুল সাত্তার (২৮) ও নেহার (৩৫) নামের দু’জনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন।
এদিকে জিডিতে কাওসার উল্লেখ করেন, গত ১৪ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে তার স্ত্রী কাজল কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। কাজলের ব্যবহৃত দু’টি মোবাইল নম্বর বন্ধ রয়েছে। জিডিতে কাজলের শারীরিক বর্ণনায় বলা হয়, তার গায়ের রং শ্যামলা, উচ্চতা আনুমানিক ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি, চুল কালো ও লম্বা, মুখমণ্ডল গোলাকার এবং তিনি থ্রি-পিস পরিহিত ছিলেন। অন্যদিকে কাজলের মা মনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, তার মেয়ে নিখোঁজের দু’দিন পর কাওসার কাজলের বাবাকে ফোন করে জানান, তার মেয়ে তাদের বাড়িতে গেছে কিনা। আসেনি বলে এ বিষয়ে আবু কাওসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজলকে সংসার খরচের টাকা দিয়ে সে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। সর্বশেষ ১৮ই সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে কাওসারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন কাজলের মা। তার বাসায় গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে আব্দুল সাত্তার ও নেহারকে পাওয়া যায়। এ সময় তারা প্রচণ্ড খারাপ আচরণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন হুমকি দেন। তিনি দাবি করেন, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে তার মেয়েকে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। তারা আমার মেয়েকে কোথাও গুম করে রাখতে পারে।
এ প্রসঙ্গে কাজলের মা মনি মানবজমিনকে বলেন, আমার একটা মাত্র মেয়ে। তারা আমার মেয়েটাকে গুম করে দিয়েছে। কাওসার বিয়ের বিষয়টি বাড়িতে লুকায়। তাকে বারবার বলতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে বলছি, বলবো বলে এড়িয়ে যায়। আমার মেয়েটার সঙ্গে কাওসার কী করেছে জানি না। এখন তাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৮ই সেপ্টেম্বর তার বাসায় গিয়ে দেখি তালা ঝুলানো। আমাদের দেখে সাত্তার ও নেহার অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। বিভিন্ন হুমকি দেয়। কাওসারের বাড়িতে ফোন দিলে তারা আমাদের গালাগালি করে। আপনারা আমার মেয়েটাকে বের করে দেন। আমির আর কিছু চাই না। কাওসারের ভাই ইউসুফ মানবজমিনকে বলেন, বিয়ের বিষয়ে আমরা জানতাম না। তাকে খুঁজে না পেয়ে থানায় জিডি করতে গিয়ে জানতে পারি। এসব বিষয়ে আমাদের কিছুই জানা নেই। এ প্রসঙ্গে জিডি’র তদন্ত কর্মকর্তা হাসান মারুফ মানবজমিনকে বলেন, কাজলের স্বামী কাওসার থানায় জিডি করেন। কাজলের ভোটার আইডি নেই। থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো। আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছি। কাজলের মা’য়ের অভিযোগের পর কাওসারকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে পাওয়া গেলেই বোঝা যাবে বিষয়টা কি। পুলিশ কাজলকে বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।