সরকারি নথিতে মালিক নেই, বরাদ্দ নেই, লিজেরও হদিস নেই—অথচ সেই জমিতেই দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুতল ভবন, মার্কেট ও বসতি। শমসের আলী নামে এক ব্যক্তি নিজের নামে ভুয়া ইজারা দেখিয়ে চার একর জমি দখল করেছেন। পরে সেই জমিতে প্লট করে সেগুলো বিক্রি করে দেন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে। প্রভাবশালীদের হাতে রাখতে কখনো তাদের নামমাত্র মূল্যে প্লট দিয়েছেন।
রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী নগর বা শমসের নগরের এ মূল্যবান জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণকৃত। শমসের আলী গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা বা কর্মচারী ছিলেন না; কিন্তু নিজেকে গৃহায়ন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বছরের পর বছর ধরে এ জালজালিয়াতি করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গৃহায়নের এ জমিতে ঢাকা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (ডুইপ) বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের আওতায় নিম্নবিত্তদের জন্য ১৯৪টি প্লট করা হয়েছিল।
কিন্তু শমসের আলীসহ গৃহায়নের একটি চক্র মিলে সেই জমি দখল করে অবৈধভাবে প্লট ও মার্কেট বানিয়ে বিক্রি করেছে। হাতিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এমনকি গৃহায়নের চক্রটির সহযোগিতায় জাল নথি তৈরি করে সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করা হয়। মামলাটি বিচারধীন থাকা অবস্থায়ও জমি বিক্রি করেছে ভূমিখেকো চক্রটি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মিরপুর-১ সেকশন, ব্লক-এইচের শাহ আলী নগর বা শমসের নগর এলাকা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধীন। বিশিল মৌজার জে এল নম্বর ২২৪-এর অধীন ১৩/৫৯-৬০ নম্বর এল এ কেসের মাধ্যমে সর্বমোট ২০২ দশমিক ৪৩ একর জমি হুকুমদখল ও অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর তৎকালীন গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের নামে ওই জমি বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওই এলাকায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেখানে পুনর্বাসন, আবাসিক, শিল্প, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক প্লটের পাশাপাশি খেলার মাঠ, স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনার জন্য জমি সংরক্ষণ করা হয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে দেওয়া হয়নি।
গৃহায়নের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর গৃহায়নের অফিসে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন শমসের আলী। একসময় অফিসে বসা শুরু করেন তিনি। নিজের ইচ্ছামতো অফিসের নথি আনা-নেওয়া ও সংরক্ষণ করতেন শমসের আলী। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে গৃহায়নের কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। তার বাড়ি ছিল মিরপুরে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসতে, সেই দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতেন।
শমসের আলী তখন জাতীয় গৃহায়নের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে ওই চার একর জমির নকল কাগজপত্র তৈরি করে নেন। তারপর সে জমি প্লট আকারে বিভিন্ন ব্যক্তির বিক্রি করেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে রাখার জন্য, তাদের প্রভাব কাজে লাগানোর জন্য তাদেরও শুধু কাগজপত্রের খরচ নিয়ে প্লট লিখে দিয়েছেন।
নথি অনুযায়ী, মিরপুর গৃহসংস্থান বিভাগ-২-এর আওতাধীন ডুইপ প্রকল্পের জন্য ১৯৪টি আবাসিক প্লট রাখা হয়। প্রতিটি প্লটের আয়তন ৪০ বর্গমিটার। কিন্তু গৃহায়নের রেকর্ডে এসব প্লট কোনো ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য নেই। এমনকি সংরক্ষিত দখল রেজিস্ট্রারেও প্লটগুলোর দখল হস্তান্তরের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব প্লট ও সংশ্লিষ্ট দাগের জমির কোনো লিজ দলিল সম্পাদনের তথ্যও নেই।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রতি শতাংশ জমির দাম ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এই ৪ দশমিক ২৬৬৬ একর জমির সরকারি মূল্য দাঁড়ায় ২১৫ থেকে ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু মিরপুরের বর্তমান বাস্তব বাজারচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে প্রতি শতাংশ জমির প্রকৃত বাজারমূল্য ১ থেকে দেড় কোটি টাকা। আর এই বাণিজ্যিক ও আবাসিক বাজারমূল্য বিবেচনা করলে বেদখল হওয়া এই বিশাল ভূখণ্ডের বর্তমান মূল্য ৪০০ থেকে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ভূমিখেকো চক্রটি সরকারের প্রায় অর্ধ-হাজার কোটি টাকার সম্পদ সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিয়েছে।
ডুইপ প্রকল্পের ১৯৪টি প্লটের জমি বিশিল মৌজার সিএস ৫১, ৫২, ৭৬ ও ৮১ নম্বর দাগে অবস্থিত। সরেজমিন জরিপের ভিত্তিতে তৈরি পেন্টাগ্রাফ নকশায় এসব দাগে মোট ৪ দশমিক ৯৩৪৭ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ দশমিক ২৬৬৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে বলে দাবি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের।
শমসের আলী এখন আর জীবিত নেই। তার মৃত্যুর পর এসব দেখাশোনা করেন তার মেয়ে শমসের আরা সাথী। তাদের পক্ষে কাজ না করায় গৃহায়নের এক প্রকৌশলীকে বিভিন্ন কৌশলে ফাঁসানোর চেষ্টার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই জমিগুলো বাবা বিভিন্ন ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করেছেন। আমাদের পরিবারের নামে কোনো জমি দেওয়া হয়নি। এই জমির কাগজপত্রের কথা আমি জানি না। বাবা মারা যাওয়ার আগে কোনো কাগজপত্র আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে যায়নি।
তথ্য বলছে, শমসের আলী, প্রোপ্রাইটর-শাহআলী নগর হাউজিং এস্টেট, মিরপুর-১-এর নামে ২০০০ সালের ২০ এপ্রিল ২১১৭ নম্বর ইজারা দলিল করা হয়। ওই দলিলের মাধ্যমে চারটি দাগে ৪ দশমিক ২৬৬৬ একর জমির দাবি করা হয়েছে। দলিলে লিজদাতা হিসেবে সহকারী কমিশনার সেটেলমেন্ট, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সেগুনবাগিচার নাম উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের রেকর্ডরুমে অনুসন্ধান করে ওই ব্যক্তির নামে এ জমি ইজারা দেওয়ার কোনো নথি পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট অফিসের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। যে জমির লিজ দেওয়ার কোনো রেকর্ডই গৃহায়নের কাছে নেই, সেই জমির ভিত্তিতে কীভাবে দখল, নামজারি ও পরবর্তী বিক্রি করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার সব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে। রাজউকের অনুমোদিত নকশা ছাড়াই অনেক প্লটে একতলা, দোতলাসহ বহুতল ভবন নির্মাণ করে বসবাস করছেন জমির মালিক দাবি করা কিছু লোকজন। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগও রয়েছে এসব স্থাপনায়। বহুতল ভবন, মসজিদ, স্কুল ছাড়াও জমিতে মার্কেট, দোকানপাট, কারখানা, রিকশার গ্যারেজ গড়ে তুলে ব্যবসা করছেন দখলদাররা। সমিতির নামে এ জমি বরাদ্দ এমন বিশাল সাইনবোর্ডও টানিয়েছেন কেউ কেউ।
গৃহায়নের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিতে এসব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানোর জন্য সেগুনবাগিচায় গৃহায়নের প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
গৃহায়নের তথ্যমতে, সরকারি জমিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং দখল ও মালিকানা সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র তৈরিতে শমসের আলীকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক কর্মচারী নুরুজ্জামান সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগে তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি রয়েছে। সরকারি জমির রেকর্ড, নামজারি ও লিজ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে, সরকারি জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করে দেওয়ানি মামলা করেছেন শাহআলী নগর হাউজিং এস্টেটের আব্দুল মতিন। ৬১ জনের পক্ষে তিনি বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
মামলার আরজিতে দাবি করা হয়েছে, বিশিল মৌজার বিভিন্ন দাগের জমি উত্তরাধিকার, আম-মোক্তার, লিজ, নামজারি ও খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোগদখলে ছিলেন। পরে ওই জমিতে হাউজিং প্লট, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করে বিক্রি করা হয়। বাদীসহ বহু ব্যক্তি এসব প্লট কিনেছেন এবং তাদের নামে সাব-কবলা দলিলও সম্পাদন হয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নথিতে এসব লিজ ও বরাদ্দের তথ্য না থাকায় জালজালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে লিজ দলিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
সরকারি অধিগ্রহণকৃত জমিতে প্লট সৃষ্টি করে বিক্রি এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও রয়েছে দখলদার শমসেরের বিরুদ্ধে। দারুস সালাম থানায় ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি করা ৭ নম্বর মামলাটি চলমান রয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। এ ছাড়া জমির মালিকানা দাবি করে ২০১৭ সালে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করা হয়। পরে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়। একদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নথিতে জমিগুলো অধিগ্রহণকৃত সরকারি সম্পত্তি এবং ডুইপ প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত বলে তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, দখলকারীদের পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার, আম-মোক্তার, লিজ, নামজারি ও খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে মালিকানা অর্জনের দাবি করা হচ্ছে।
সরকার জমি অধিগ্রহণের পর সেই জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে আছে ব্যক্তিমালিকানার দাবি করা কয়েকজন ব্যক্তি। গৃহায়নের রেকর্ডে লিজ বা বরাদ্দের তথ্য না থাকলেও কীভাবে নামজারি ও সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে জমি হাতবদল হলো। আর সরকারি প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত ১৯৪টি নিম্নবিত্ত প্লটই বা কীভাবে ব্যক্তির দখলে গেল—এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইল জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম কালবেলাকে বলেন, গৃহায়নের গেজেটভুক্ত জমি কেউ দখলে নিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই জমি উদ্ধার করতে যা করার দরকার, সরকারের আইন অনুযায়ী তাই করা হবে। এই জমিতে ডুইপ প্রকল্পের নিম্নবিত্তের জন্য ১৯৪টি আবাসিক প্লট করেছিল এবং মাস্টারপ্ল্যান করেছিল।