জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিএনপি যে আশঙ্কা করেছিল, এক বছর পর সেই প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে। তখন দলটি বলছিল, আগে গণভোটে সংস্কারের অনুমোদন নেওয়ার পর নির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংশোধন করলে ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আবারও গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। এখন বিএনপি নিজেই বলছে, সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নতুন করে গণভোট করতে হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট হয়ে যাওয়ার পরও কেন এই প্রশ্ন উঠছে, তার উত্তর খুঁজতে হলে বিএনপির অবস্থানের ধারাবাহিকতাটি দেখতে হয়।
কেন আপত্তি করেছিল বিএনপি
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ হয়। কমিশনের প্রস্তাব ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার একটি ‘সাংবিধানিক আদেশ’ জারি করবে এবং সংসদ নির্বাচনের দিন ওই আদেশের ওপর গণভোট হবে। বিএনপি তখন ওই প্রস্তাবে আপত্তি জানায়।
দলটির হয়ে আলোচনায় থাকা বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “নির্বাচনের দিন গণভোটে সাংবিধানিক পরিবর্তনের অনুমোদন নেওয়ার পর নির্বাচিত সংসদ যদি সংবিধান সংশোধন করে, তাহলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের কারণে আবার গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে।”
সে দিন তার বক্তব্য ছিল, যে পদ্ধতিই গ্রহণ করা হোক না কেন, সংবিধান সংশোধনের পর আরেকটি গণভোট আয়োজন করতে হবে। তার মানে একই বিষয়ে দুটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
অর্থাৎ জনগণের ভোট নেওয়ার প্রশ্নে বিএনপির আপত্তি ছিল না। আপত্তির জায়গা ছিল একই সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য আগে একবার গণভোট এবং পরে সংবিধান সংশোধনের পর আবার গণভোটের সম্ভাবনা নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত যে গণভোট
আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য আলাদা আইনি কাঠামোয় গণভোটের ব্যবস্থা করা হয়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি হওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ভোট নেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ফল অনুযায়ী, চার কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি ‘হ্যাঁ’ এবং দুই কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি ‘না’ ভোট পড়ে।
এ পর্যায়ে বিএনপির ২০২৫ সালের আশঙ্কার দ্বিতীয় অংশটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে–এই গণভোটের পর সংসদে সংবিধান সংশোধন করতে গেলে ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান কীভাবে কার্যকর হবে?
১৪২ অনুচ্ছেদ কেন গুরুত্বপূর্ণ
গত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ভোটাররা জুলাই জাতীয় সনদ ও তার বাস্তবায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে মত দিয়েছেন। এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে পাস হওয়ার পর অনুষ্ঠিত ভোট ছিল না।
অন্যদিকে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে এই অনুচ্ছেদের গণভোটসংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ে সেই গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত আসে। রায়ে প্রস্তাবনা এবং ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদের মতো নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধানের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রশ্নটি আবার সামনে আসে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “প্রস্তাবনা ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট সাংবিধানিকভাবে প্রয়োজন হবে।”
আবার গণভোট কেন?
বিএনপির বর্তমান অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। ২৭ সেপ্টেম্বর বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সংবিধানের যেসব বিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক, সেসব বিষয়ে সংসদে সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোট করতে হবে।”
অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট হয়ে যাওয়ার পরও বিএনপি বলছে, সংসদে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনী পাস হলে এবং সেটি ১৪২ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়লে পরবর্তী পর্যায়ে গণভোট প্রয়োজন হবে।
এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করলে একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। তখন বিএনপি আশঙ্কা করেছিল, জুলাই সনদ নিয়ে একটি গণভোটের পর সংশোধনের কারণে আবার ভোটের প্রয়োজন হতে পারে। এখন দলটি সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটিই অনুসরণের কথা বলছে।
তাহলে আগের ভোটের কী হবে
বিএনপির বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটকে জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাবের ওপর জনগণের সম্মতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপর সংসদ সেই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনী করবে।
সেই সংশোধনীর কোনোটি যদি ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ গণভোটের আওতায় পড়ে, তাহলে সংসদে বিল পাসের পর আবার গণভোট হতে পারে। অর্থাৎ বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট এবং ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোট একই ধরনের ভোট নয়।
প্রথমটি ছিল জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবের ওপর জনগণের মত নেওয়ার প্রক্রিয়া। আর দ্বিতীয়টি হবে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনী কার্যকর করার আগে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ।
তত্ত্বাবধায়ক নিয়েও একই দাবি
এই অবস্থান থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান নিয়েও বিএনপি আলাদা গণভোটের সুরক্ষার কথা বলছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি বিধানকে ভবিষ্যৎ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের আওতায় রাখার প্রস্তাব বিএনপি দিয়েছে।
এর অর্থ, বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী এসব বিধানে ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনতে হলে সংসদীয় প্রক্রিয়ার পাশাপাশি জনগণের অনুমোদনের বিষয়টিও যুক্ত থাকবে।
দুই সময়ের বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে বিএনপির অবস্থানের মূল প্রশ্নটি একই জায়গায় থাকে।
২০২৫ সালে দলটি জানতে চেয়েছিল, জুলাই সনদের ওপর একবার গণভোট হওয়ার পর সংসদে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান কী হবে?
এখন দলটি বলছে, ১৪২ অনুচ্ছেদের আওতাভুক্ত সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রে ওই অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফলে বিএনপির বর্তমান বক্তব্যকে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট বাতিল বা অস্বীকার করার অবস্থান হিসেবে দলটি উপস্থাপন করছে না। বরং তাদের বক্তব্যের কেন্দ্র হলো– জুলাই সনদের ওপর পাওয়া গণরায় এবং সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া দুটি আলাদা ধাপে কীভাবে যুক্ত হবে।
যে প্রশ্নের উত্তর বাকি
তাই ‘আবারও গণভোট’ প্রশ্নটির উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না-তে দেওয়া যাচ্ছে না। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে মত দিয়েছে। এরপর সংসদে সেই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
সেই সংশোধনীর কোনো অংশ যদি সংবিধানের পুনর্বহাল হওয়া ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের আওতায় পড়ে, তখন নতুন গণভোটের প্রশ্ন উঠবে–এটাই বিএনপির বর্তমান অবস্থানের মূল কথা।
অর্থাৎ ২০২৫ সালে বিএনপি যে ‘দুই গণভোটের’ সম্ভাবনার কথা বলেছিল, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের পর এখন সেই প্রশ্নই বাস্তব সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এখন মূল বিষয় হলো, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের গণরায়কে পরবর্তী সাংবিধানিক সংশোধনের সঙ্গে কীভাবে আইনি অর্থে যুক্ত করা হবে এবং ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের শর্ত পূরণে সেটি যথেষ্ট কি না।
এই আইনি ব্যাখ্যার ওপরই নির্ভর করবে জুলাই জাতীয় সনদের কোন কোন সংস্কার বাস্তবায়নে আবার গণভোটের প্রয়োজন হবে।