গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা এখন পলাতক অথবা কারাগারে। দেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়েছে। কারাগারে থাকা নেতাদের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্যে না এলেও পলাতক নেতাদের দ্বন্দ্ব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
অস্তিত্বের সংকট ও দেশে নেতৃত্বশূন্য অবস্থার মধ্যে পলাতক নেতাদের বিরোধ সামলাতে দিল্লিতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে প্রধান করে একটি কোর কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে গঠন করা হয়েছে আওয়ামী লীগ রিসার্চ টিম (এআরটি) নামে আরেকটি প্ল্যাটফর্ম।
দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা টাইমস’কে জানান, সারা দেশে আওয়ামী লীগের ৮৩টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের প্রায় সব কটিতেই বিরোধ রয়েছে। শেখ হাসিনা অনলাইনে যুক্ত থাকা বৈঠকেও বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে বক্তব্য ও অভিযোগ তুলে ধরছেন। এসব কোন্দলের পেছনে সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য, কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার ইন্ধন রয়েছে- এমন অভিযোগও এখন আর গোপন নেই।
এর মধ্যে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর কোন্দল আরও বেড়েছে। এতে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি লন্ডন থেকে কলকাতায় ফিরে আসা আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান টাইমস’কে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ও বৃহৎ সংগঠন। এর কর্মী-সমর্থক শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এত বড় সংগঠনে কিছু বিরোধ থাকতে পারে। তবে সময়ের প্রয়োজনে সব মিটে যাবে। ডিসেম্বরের আগেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ফেনী, টাঙ্গাইল ও নোয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় নেতৃত্বের প্রকাশ্যে বিরোধ চলছে। এর বাইরে প্রায় সব জেলা-উপজেলায় কম বেশী সাংগঠনিক বিরোধ রয়েছে।
শেখ হাসিনা অনলাইনে যুক্ত থাকা অবস্থায় অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে এসব সাংগঠনিক বিরোধের চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বিরোধ মিটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দলের সভানেত্রীর ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে অনেকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি প্রায় বিপরীত।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, এসব বিরোধের পেছনে মূলত কর্তৃত্ব, দলীয় পদ এবং আগামী দিনে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতা কাজ করছে। সংগঠন এমন অগোছালো থাকার মধ্যেই শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমন কোন্দলকে বড় করে দেখতে চাননা। টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার বার্তা চূড়ান্ত। আওয়ামী লীগের শক্তি হচ্ছে তৃণমূল। তারাই ঐক্য গড়ে তুলেছে। জেলা-উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় বিরোধ মেটানোর চেষ্টা চলছে। অনেক স্থানে বিরোধ নিরসন হয়েছে। এর মধ্যে অনেক সাংগঠনিক কমিটিও নতুন করে গঠন করা হয়েছে।’
তবে নাছিমের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষন করেন আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টাইমস’কে বলেন, সব জেলাতেই কোন্দল আছে। কেন্দ্রের শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও বিরোধ রয়েছে। দলের এই কঠিন সময়ে অনেকে কারাগারে এবং প্রায় সবাই আত্মগোপনে থাকলেও কোন্দল কমেনি।
তিনি জানান, শেখ হাসিনা আসনভিত্তিক এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনলাইন বৈঠকেও যুক্ত হচ্ছেন। তিনি গ্রুপিং ভুলে সবাইকে এক হওয়ার কঠোর বার্তা দিয়েছেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিরোধ নিরসনে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকেরাও কাজ করছেন। তবে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে কোনো কোনো জায়গায় কোন্দল আরও বাড়ছে।
রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী টাইমস’কে বলেন, ‘শেখ হাসিনা তৃণমূলের সভায় নিজেদের মধ্যকার বিরোধ মিটিয়ে সংগঠিত হতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যেসব এলাকায় বিরোধ রয়েছে, এর কারণ চিহ্নিত করে তা নিরসনের জন্য কোর কমিটি করে দিয়েছেন। তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।’
এআরটি ও কোর কমিটি
দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জানান, আওয়ামী লীগ রিসার্চ টিম বা এআরটি কেন্দ্রীয়ভাবে সারা দেশের সাংগঠনিক কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করছে। সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসনে কাজ করছে কোর কমিটি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কোর কমিটির চেয়ারম্যান।
প্রতিটি জেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের তদারকিতে কোর কমিটির সদস্যরা কাজ করছেন। এআরটি সারা দেশে নেতা-কর্মীদের মধ্যে অনলাইনে সংযোগ স্থাপন এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের যোগাযোগ তৈরি করছে।
কোর কমিটির কাজের মধ্যে রয়েছে দলে কারা কীভাবে সক্রিয়, কারা নিষ্ক্রিয়, কারা কারাগারে, কারা জামিনে এবং কার বিরুদ্ধে কতটি ও কী ধরনের মামলা রয়েছে- এসব তথ্যের ভিত্তিতে সাংগঠনিক অবস্থার প্রতিবেদন তৈরি করা। এআরটি এসব প্রতিবেদন সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করছে। এতে আসনভিত্তিক সাংগঠনিক পরিস্থিতির চিত্রও থাকছে।
কোর কমিটিতে জেলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতাদের পাশাপাশি জেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, সাবেক পৌর মেয়র ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা রয়েছেন। অনেক জেলায় ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতারাও এতে যুক্ত আছেন।
ঢাকা জেলায় কোর কমিটির সদস্য ২৪৫ জন। তাদের মধ্যে ৩৫ জনকে ইউনিয়নভিত্তিক সাংগঠনিক প্রতিবেদন তৈরির বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা ভার্চুয়ালি সভা করে সমস্যা চিহ্নিত ও নিরসনে কাজ করছেন।
একইভাবে সব সাংগঠনিক ইউনিটে কোর কমিটি রয়েছে। তবে একেক ইউনিটে সদস্যসংখ্যা একেক রকম।