ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এসব এলাকায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, অনেকটা দায় সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন করপোরেশনের লোকজন। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসির পদক্ষেপ কতটা ফলপ্রসূ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
ডিএসসিসির মুগদা, মান্ডা ও খিলগাঁও এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা মাঝেমধ্যে মশার ওষুধ ছিটালেও তা নিয়মিত নয়। মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস, স্তূপ করে রাখা ময়লা-আবর্জনা সরানো ও জমে থাকা পানি অপসারণে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই।
যদিও ডিএসসিসির দাবি, হাসপাতালগুলো থেকে ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করা হচ্ছে। যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, সেসব এলাকায় বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
রোগী বেশি যেসব এলাকায়
মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ দেখতে পান স্ট্রিমের এই প্রতিবেদক। হাসপাতালের ৮, ১১ ও ১২ তলায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে। ৮ম তলায় শিশু এবং ১১ ও ১২তম তলায় প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শয্যার বাইরে মেঝেতেও বিছানা পেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম জানান, শুরুতে ৬০টি শয্যা নিয়ে ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছিল। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ২০টি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০টি শয্যা ছিল। রোগীর চাপ বাড়ায় পরবর্তী সময়ে আরও শয্যার ব্যবস্থা করা হয়।
বর্তমানে মুগদা হাসপাতালে ৪৬টি শিশু এবং নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৮২ জন প্রাপ্তবয়স্ক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন বলে জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘ডিএসসিসি এলাকার মধ্যে মুগদা, মান্ডা, মালিবাগ, খিলগাঁও ও ডেমরা থেকে বেশি রোগী আসছেন। এর বাইরে নারায়ণগঞ্জ থেকেও উল্লেখযোগ্য রোগী ভর্তি রয়েছেন।’
তবে এসব এলাকাকে ‘ডেঙ্গুর হটস্পট’ বলতে রাজি নন তিনি। তাঁর ভাষ্য, রোগীরা সাধারণত নিজেদের এলাকার কাছাকাছি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। ফলে মুগদা হাসপাতালে আশপাশের এলাকার রোগী বেশি ভর্তি হওয়া মানেই ওই এলাকাগুলো ডেঙ্গুর হটস্পট, এমনটা বলা যায় না।
ডিএসসিসির ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে মুগদাপাড়া এলাকা। সেখানে ৭ বছর ধরে চায়ের দোকান চালান কুদরত আলী।
মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে ওষুধ ছিটায়ে চলে যায়। তবে সেটা নিয়মিত না; মাঝে মাঝে তাদের দেখা যায়। শুধু রাস্তার ওপর ছিটায়ে চলে যায়। আশপাশের ময়লা কিংবা আবর্জনাযুক্ত এলাকায় তাদের কখনো ওষুধ ছিটাতে দেখি না।’
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও তেমন একটা চোখে পড়ে না বলে জানান কুদরত।
ডিএসসিসির ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের মান্ডা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন, এমন অন্তত ৬ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
স্থানীয়রা জানান, অন্যান্য বছরের মতো এবারও গতানুগতিকভাবে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। অথচ আগের বছরের চেয়ে এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশি।
মুগদা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, খিলগাঁও থেকেও নিয়মিত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন সেখানে। ডিএসসিসির ১, ২, ৩ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে খিলগাঁও এলাকা। এর মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খিলগাঁও, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করেন আবদুল হালীম। তিনি বলেন, ‘যে যে এলাকায় সবজি বিক্রি করি, সবদিকেই ডেঙ্গু রোগীর কথা কিছু শুনি। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোনো কিছুই চোখে পড়ে না।’
‘সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি’
অভিযোগের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের লোকজন প্রত্যেকটা হাসপাতালে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে—কোন কোন এলাকা থেকে বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে।
‘যে এলাকা থেকে বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে, সেখানে আমরা বেশি ওষুধ ছিটিয়ে দিচ্ছি। যদি ছোট কোনো জায়গায় পানি জমে থাকে, সেখানেও তারা ওষুধ দিচ্ছে।’
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
এদিকে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত গাড়ি, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রাম, ফুলের টব, ভাঙা পাত্র ও রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।
তাঁর মতে, ডেঙ্গুকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জুনের পর ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। জানুয়ারিতে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জন। জুনে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ২ হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজারের বেশি।
সেপ্টেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। কেবল এই মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অথচ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ভর্তি ছিলেন ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন। সেপ্টেম্বর মাসে মারা গেছেন সর্বোচ্চ ১৪৮ জন।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৯ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ৯ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৭০ জন; যা অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও বিভাগ থেকে এককভাবে সবচেয়ে বেশি।