ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সেবা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ও দন্তচিকিৎসক ডা. ওরাকাতুল জান্নাত। ট্রলি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ পেতে বিলম্ব, বসার জায়গার সংকট এবং জমজমের পানি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে নিজের ফেসবুক পেজে একটি লাইভ ভিডিও করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রচারিত ওই ভিডিওতে ওরাকাতুল বলেন, ট্রলি পেতেই তাঁকে প্রায় ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। পরে লাগেজের জন্যও অপেক্ষা করতে হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা বিমানবন্দরে থাকার সময় লাগেজ সংগ্রহের জায়গায় বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বয়স্ক মানুষ ও শিশুসহ যাত্রীদের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
একপর্যায়ে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ভোগান্তি দেখার বা এ নিয়ে কথা বলার কেউ নেই। পরে এই দুর্ভোগকে তিনি ‘জীবনভরের সাফারিং’ বলেও উল্লেখ করেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন ওরাকাতুল জান্নাত। সেই সঙ্গে সামনে আসে তাঁর পারিবারিক ও পেশাগত পরিচয়ও। সেখানে বলা হয়, তাঁর বাবা জামায়াতের নেতা, মা মাহফুজা হান্নান সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য এবং স্বামী সাবেক শিবির সভাপতি। পাশাপাশি পোস্টগুলোতে বলা হয়, ওরাকাতুল জান্নাতের চিকিৎসক পরিচয়ের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এসব দাবির পক্ষে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা খতিয়ে দেখেছে স্ট্রিম।
মা-বাবার পরিচয় কী
স্ট্রিমের যাচাইয়ে পাওয়া সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪১-এর সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামী মোঃ আব্দুল হান্নান। তিনি সিলেট জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন তিনি। পরে জোটগত আসন সমঝোতার কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।
তবে ওই হলফনামায় ওরাকাতুল জান্নাতের নাম পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে স্ট্রিমের পক্ষ থেকে মাহফুজা হান্নানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ওরাকাতুলকে নিজের মেয়ে বলে নিশ্চিত করেন। বলেন, ‘ও আমার মেয়ে।’ তাঁর ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করেন ওরাকাতুল।
ওই ফোনালাপেই ওরাকাতুল বলেন, ‘অবশ্যই আমার আব্বা জামায়াতের নেতা, আম্মা জামায়াতের কারেন্ট এমপি।’ তবে তিনি এটিকে তাঁর মা-বাবার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্বামীর পরিচয় নিয়ে যা জানা গেল
মাহফুজা হান্নান কথোপকথনে মোহাম্মদ রেদুয়ানুর রহমানকে তাঁর মেয়ের স্বামী হিসেবে নিশ্চিত করেন। ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামি)-এর একটি প্রকাশনায় তাঁকে ওয়ামি বাংলাদেশের পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে রেদুয়ানুর রহমান শিবিরের সভাপতি ছিলেন কি না, জানতে চাইলে মাহফুজা বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। ওরাকাতুলও স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কোনো তথ্য দিতে চাননি।
বিএমডিসির নথিতে যা পাওয়া গেল
ফেসবুকে ছড়ানো পোস্টে বলা হয়, ওরাকাতুল জান্নাতের বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং তাঁর চিকিৎসক পরিচয়ের পক্ষে প্রমাণও মেলেনি। তবে স্ট্রিমের যাচাইয়ে ওয়ামি ডেন্টাল কেয়ারের ফেসবুক পেজের একটি পোস্টে তাঁর বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর ৩৩১৯ পাওয়া যায়।
নম্বরটি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন যাচাইয়ের পোর্টালে পরীক্ষা করে সেখানে ওরাকাতুল জান্নাতের নাম পাওয়া যায়। প্রোফাইলে দুটি ছবি রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ওরাকাতুল জান্নাতের চেহারার মিল রয়েছে। বিএমডিসির তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিবন্ধিত বিডিএস চিকিৎসক। তাঁর নিবন্ধনের অবস্থা সক্রিয় এবং মেয়াদ সেপ্টেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত। নিবন্ধনের বছর ২০০৮।
একই বিএমডিসি রেকর্ডে তাঁর অতিরিক্ত ডিগ্রি ও বিশেষায়ন হিসেবে অর্থোডন্টিকসে মাস্টার অব সায়েন্স ইন ডেন্টিস্ট্রি উল্লেখ রয়েছে। রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনে ফিলিপাইনের ম্যানিলার সেন্ট্রাল এসকোলার ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি এই ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্ট্রিমকে ওরাকাতুল জানান, তিনি বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজ থেকে পাস করে সেখানেই ইন্টার্নশিপ করেন এবং পরে সোহরাওয়ার্দীতে পিজিটি করেন। মাস্টার্সের বিষয়ে তিনি ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ম্যানিলা সেন্ট্রাল এসকোলার ইউনিভার্সিটি বলে উল্লেখ করেন।