দেশে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও বিভিন্ন এলাকায় সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকদের বিক্ষোভ-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। এর পেছনে আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সারের একটি অংশ মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে গত দুই মাস ধরে এই চোরাচালান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন উপকূলজুড়ে শুরু হয়েছে ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’। অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।
সূত্রের দাবি, দেশের বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের ডিলার পর্যায়ে দাম ১,২৫০ টাকা এবং কৃষক পর্যায়ে ১,৩৫০ টাকা। অথচ একই সার মিয়ানমারে বাংলাদেশি প্রায় ৯,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দামের এই বিপুল ব্যবধানই সার পাচারের পেছনে বড় উৎসাহ জোগাচ্ছে।
চোরাকারবারিরা একটি কাঠের বোট বা মাছ ধরার নৌকায় প্রায় এক হাজার বস্তা সার পাচার করছে। বাংলাদেশের বাজারদরে এ পরিমাণ সারের মূল্য সাড়ে ১২ লাখ টাকা। মিয়ানমারে তা বিক্রি হচ্ছে ৯০ লাখ টাকায়। ক্ষেত্রবিশেষে দাম আরো বেশি পাওয়া যায় বলে সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পাচার করা সারের জন্য ডিলার ও আমদানিকারকদের একটু বেশি দাম দিতে হয়। এক হাজার বস্তার একটি চালান মিয়ানমারে পৌঁছাতে বোট ভাড়া, ক্যারিয়ার, অতিরিক্ত দাম এবং ধরা পড়লে ছাড়িয়ে আনার খরচসহ মোট ব্যয় হয় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা। বিপরীতে মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা ওই চালান কিনছেন ৯০ লাখ টাকায়।
চোরাচালানের ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্থও দেওয়া হচ্ছে। এক হাজার বস্তা সারের একটি চালানের জন্য মিয়ানমার সিন্ডিকেট বাংলাদেশি সিন্ডিকেটকে ৯০ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়। এর নিরাপত্তা হিসেবে একটি খালি বোট ও একজন মাঝিকে মিয়ানমারে রেখে আসতে হয়। সার পৌঁছে দিলে বোট ও মাঝিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
কোস্ট গার্ডের একটি সূত্র জানায়, মিয়ানমারের একটি সিন্ডিকেট বাংলাদেশি আরেকটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলে এই সার চোরাচালান করছে গত দুই মাস ধরে। সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইন, চিন ও মংডু অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্থানীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে সার ও নির্মাণসামগ্রীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল—এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে চোরাকারবারিরা।
তারা মাছ ধরার ট্রলার কিংবা সাগরে চলাচল উপযোগী কাঠের নৌকা ভাড়া করে নৌপথে সার পাচার করছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূলীয় ঘাট থেকে সার তুলে গভীর সাগর হয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে আসা বাঁশখালীর এক তরুণ মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক ব্যক্তির তিনটি বোট রয়েছে। সম্প্রতি চোরাকারবারিরা দুটি বোট ভাড়া নেয়। এর একটিতে তিনি ছিলেন। চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট থেকে সার বোঝাই করে প্রথমে মিরসরাই উপকূলে এবং পরে গভীর সাগর হয়ে দুই ট্রলার বোঝাই সার নিয়ে মিয়ানমারে পৌঁছান তারা।
তিনি জানান, সার নামানোর পর একটি ট্রলারে করে সবাই ফিরে এলেও তাকে আরেকটি ট্রলারসহ সেখানে রেখে আসা হয়। এক সপ্তাহের বেশি সময় তিনি মিয়ানমারে আটকা ছিলেন। সেখানকার ব্যবসায়ীরা তাকে খাবার দিলেও তাকে নৌকাতেই ঘুমাতে হয়েছে।
পরে তিনি জানতে পারেন তাকে ও নৌকাটি রেখে বাংলাদেশি চোরাকারবারিরা পরবর্তী চালানের অগ্রিম নিয়ে চলে এসেছে। কথা ছিল দুদিন পর ফিরে এসে তাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু পরবর্তী চালান কোস্ট গার্ড আটক করায় তাদের ফিরতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগে।
তার ভাষ্য, গত দুই মাস ধরে এভাবেই সার পাচার হচ্ছে। অগ্রিম ছাড়া চোরাই সার নিয়ে গেলে মিয়ানমার ব্যবসায়ীরা কম দাম দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই নিরাপত্তা হিসেবে একটি নৌকা ও মাঝিকে জিম্মায় রেখে অগ্রিম টাকা নিয়ে আসেন বাংলাদেশি চোরাকারবারিরা।
২৫৫ টন সার জব্দ
কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন জানিয়েছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সার চোরাচালানের প্রবণতা বেড়েছে। কোস্ট গার্ডের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো বক্তব্যে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা সার পাচার করছে।
গত জুলাই থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫৫ টন সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ৯৫ চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে এসব ঘটনায় ১৫টি মামলা হয়েছে।
চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট থেকে আমদানি করা সার বিভিন্ন বোট ও লাইটার জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। মাঝপথে কোনো ঘাটে জাহাজ ভিড়িয়ে সেখান থেকে কাঠের বোটে করে সার মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার ডিলারের কাছ থেকেও সার সংগ্রহ করে সড়কপথে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও নোয়াখালীর বিভিন্ন ঘাটে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে বোটে করে তা মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে।
বিশেষ করে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপকূলীয় এলাকায় ট্রাক থেকে সার নামিয়ে মিয়ানমারগামী মাছ ধরার বোটে তোলা হয়। সম্প্রতি এমন বেশ কয়েকটি চালান আটক করা হয়েছে।
‘অপারেশন সার সুরক্ষা’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোস্ট গার্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, সার চোরাচালান প্রতিরোধের আইন দুর্বল হওয়ায় আটকরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতে কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করে আসামিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাটে অভিযান চালিয়ে ৯৬০ বস্তা ইউরিয়াসহ চারটি ট্রাক, একটি ফিশিং বোট ও তিন চোরাকারবারিকে আটক করে কোস্ট গার্ড। পরে তাদের উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া আক্তার জানান, কোস্ট গার্ডের হস্তান্তর করা তিনজন শ্রমিক ছিলেন। যাচাই-বাছাই করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা সার স্পটে নিলাম ডেকে বিক্রি করে টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, চারটি ট্রাক ও একটি বোট এখনো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মালিক পক্ষ এলে কাগজপত্র যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে ট্রাক থেকে বোটে তোলার সময় ৭০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়।
নজরদারি বাড়িয়েছে কোস্ট গার্ড
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জব্দ করা সার চোরাচালানের সামান্য অংশ মাত্র। এরচেয়ে অনেক বেশি সার পাচার হয়ে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রতি ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
অভিযানে উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন ঘাটে নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সার্বক্ষণিক টহল, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। সন্দেহভাজন নৌযানে তল্লাশি এবং বিশেষ অভিযান চালিয়ে সার চোরাচালান প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।
সার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের বাজারে সারের চাহিদা থাকলেও বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, পাচার করা সারের বড় অংশই যাচ্ছে মিয়ানমারে। সেখানে সারের চাহিদা বেশি এবং রিসিভার গ্রুপের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সার চোরাচালান সাম্প্রতিক সময়ে বাড়লেও মাদক পাচারকে কেন্দ্র করে দুদেশের চোরাকারবারিদের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ রয়েছে। সেই পুরোনো যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে নিত্যনতুন কৌশলে সার পাচার করা হচ্ছে। আগে কান্ট্রি বোটে সার ও নির্মাণসামগ্রী পাচার হলেও এখন মাছ ধরার নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে।
এক বস্তায় সাত হাজার টাকা লাভ
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমদানি করা সার মাদার ভেসেল থেকে খালাসের পর আমদানিকারকের গুদামে যায়। সেখান থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে ডিলারদের অনুকূলে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডিলাররা সড়ক বা নৌপথে সেই সার নিয়ে যান।
তার অভিযোগ, মাঝপথ থেকেই এই সার মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে। এক বস্তা সারে সাত হাজার টাকার বেশি লাভ হওয়ায় পাচারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সার পাচার ঠেকানো না গেলে দেশের বাজারে সংকট আরো ঘনীভূত হবে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে মিয়ানমারে পাচারের সময় সার জব্দের খবর পাওয়া যায়। জব্দ করা সম্ভব হলে ভালো; কিন্তু পাচার হয়ে গেলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি বলেন, ফসল উৎপাদনের জন্য সময়মতো পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সারের ঘাটতি হলে এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। তাই প্রশাসনের উচিত তৃণমূল পর্যায়ে তদারকি বাড়ানো। কৃষি বিভাগও এ বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিলারদের গুদামে সারের মজুত পর্যবেক্ষণসহ তদারকি জোরদার করা হচ্ছে।