পেঁয়াজ পচন থেকে রক্ষা এবং কৃষকের ভাগ্য বদলাতে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি ও জলবায়ু ফান্ডের অর্থায়নের আওতায় বাস্তবায়িত এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়ম ও কারিগরি জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। নির্ধারিত ক্ষমতার মোটরের পরিবর্তে নামসর্বস্ব লোকাল কারখানায় তৈরি নিম্নমানের বেশি ওয়াটের মোটর ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
সস্তায় মোটর কিনে তা ব্যবহার করায় বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে। আগামীতে এই পদ্ধতি সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা হলে বেশি ক্ষমতার মোটরের কারণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত উদ্যোগটি পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে। সঠিক মাত্রায় আলোক সঞ্চালনের অভাবে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এতে মেশিনের মান, মোটরের ক্ষমতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ত্রুটি এবং সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে লাভবান হয়েছে পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ারফ্লো মেশিন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এবং মাঠপর্যায়ের কতিপয় অসৎ কৃষি কর্মকর্তা। অনিয়মের মাধ্যমে তাদের পকেটে ঢুকেছে রাষ্ট্রের কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ (ডিএই) বিভিন্ন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, সঠিক মাত্রায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ৩০০-৩৫০ ওয়াটের জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, ৪০০-৭৪৬ ওয়াটের অননুমোদিত ও নিম্নমানের লোকাল মোটর দেওয়া হয়েছে। এতে পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকের সুবিধার চেয়ে ভোগান্তিই বেড়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে পাঁচগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ খরচ। অন্যদিকে, সরকারি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘সোলারাইজেশন’ পরিকল্পনাও পড়েছে চরম ঝুঁকিতে।
ডিএই সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ১৫ হাজার পেঁয়াজ সংরক্ষণ এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে নেওয়া হয়, জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে এ সংক্রান্ত পৃথক প্রকল্প। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৩,৪২৩টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেশিন বিতরণ করা হয় পেঁয়াজ সমৃদ্ধ জেলা রাজবাড়ীতে, যেখানে প্রায় ৩,০০০ মেশিন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নাটোর, ফরিদপুর, পাবনার সুজানগর, মাদারীপুর ও মুন্সীগঞ্জসহ প্রধান প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে এসব মেশিন পাঠানো হয়। কিন্তু বিতরণ প্রক্রিয়া শুরু হতেই মাঠপর্যায়ে কারিগরি সমন্বয়হীনতা ও ভয়াবহ দুর্নীতি সামনে আসতে শুরু করে।
পেঁয়াজ এয়ারফ্লো মেশিন সরবরাহকারী স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জিএসএম ইঞ্জিনিয়ারিং একটি। কথা হয়, এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাইফুল আলমের সঙ্গে। আমার দেশকে তিনি বলেন, একটি এয়ারফ্লো মেশিন স্থাপনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ২১ হাজার টাকা। এ নিয়ে আমাদের সঙ্গে ডিএইর আলোচনা হয়। তাদের মোটরের অফিশিয়াল স্পেসিফিকেশন ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ ওয়াট। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বলা হয়, ৪০০ থেকে ৭৪৬ ওয়াটের মোটর সরবরাহ করতে হবে। তবে যে উদ্দেশ্যে এয়ারফ্লো মেশিন লাগানো হচ্ছে, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওই মোটর সরবরাহ করা হলে আমার প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে। তাই আমি সরে আসি। পরবর্তী সময়ে জেনেছি, স্থানীয় ও স্বীকৃত নয়, এমন প্রতিষ্ঠান থেকে এগুলো নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের বিদ্যুৎ বিল বেশি আসবে এবং সৌরবিদ্যুতে কনভার্ট করতে চাইলে মোটরের ক্ষমতার কারণে তা সম্ভব হবে না।
ডিএইতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আদর্শ এয়ারফ্লো মেশিনের মোটরের অফিশিয়াল স্পেসিফিকেশন ছিল ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ ওয়াট। যার গতি ছিল ২৬০০-২৮০০ আরপিএম এবং এয়ারফ্লো ৯-১১ মিটার প্রতি সেকেন্ড। এই মানের সাবস্টিটিউট বা মানসম্মত আমদানি করা মোটরের পাইকারি মেকিং খরচ পড়ে প্রায় ১৭ হাজার টাকা। ১০ বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টি ও লাভসহ সরকারি বাজেট নির্ধারণ করা হয় ২০-২১ হাজার টাকা। অথচ ঠিকাদার ও অসাধু কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট করে বিদেশ থেকে আমদানি করা উচ্চমানের মোটরের পরিবর্তে মাত্র ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকার ৭৪৬ ওয়াটের লোকাল নিম্নমানের মোটর দিয়ে ১২-১৩ হাজার টাকার মধ্যে মানহীন মেশিন তৈরি করে বিতরণ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারিজ টিউন বা নিবন্ধিত কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক সমিতির ন্যূনতম কোনো রেজিস্ট্রেশনও ছিল না।
কারিগরি এই কারচুপির কারণে সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকদের। অফিশিয়াল স্পেসিফিকেশনের ৩০০ ওয়াটের মেশিন চললে একজন কৃষকের মাসে আনুমানিক ৪০০-৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসার কথা ছিল। কিন্তু ৭৪৬ ওয়াটের উচ্চক্ষমতার নিম্নমানের মোটর ব্যবহার করায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের কারণে লাইনের স্ল্যাব অতিক্রম করে বিল দাঁড়িয়েছে ২৪০০-২৫০০ টাকায়। ফলে পেঁয়াজ পচনের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুতের বাড়তি খরচে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম কৃষকের।
শুধু কৃষকের পকেট কাটায় শেষ নয়, এই জালিয়াতির ফলে সরকারের সুদূরপ্রসারী ‘সোলার নীতি’ রূপায়ণ থমকে গেছে। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সব ইলেকট্রিক্যাল কৃষি যন্ত্র সোলারাইজেশন বা সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০০ ওয়াটের একটি মেশিনে ডিসি প্যানেল ও ইনভার্টার মিলিয়ে ২৩-২৪ হাজার টাকায় সোলারাইজেশন সম্ভব ছিল। কিন্তু মাঠে দেওয়া ৭৪৬ ওয়াটের মেশিনের জন্য অতিরিক্ত ফ্যান ও তিনটি সোলার প্যানেল লাগবে, যার ফলে সোলারাইজেশন খরচ লাফিয়ে ৫০-৫৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকবে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করা সরকার ও কৃষক কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, নির্ধারিত ১০ ফুট বাই ১০ ফুট এবং ৬ ফুট উচ্চতার গুদামে পেঁয়াজের লোড দিয়ে মোটরের ওয়াট কিংবা আরপিএম মাঠপর্যায়ে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে মেশিনগুলো গ্রহণ ও বিতরণ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। মূলত রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নাটোর ও পাবনার স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা (ডিডি) এবং উপজেলা কৃষি অফিসারদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ও অসচ্ছতায় এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। উদ্ভাবকের দীর্ঘ গবেষণালব্ধ টেকসই প্রযুক্তিকে জালিয়াতির মাধ্যমে কৃষকের বোঝা বানানোর এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে এয়ারফ্লো মেশিন নিয়ে মিশ্র তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরে ফরিদপুর অঞ্চলে কৃষকরা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এয়ারফ্লো মেশিন ঠিকমতো চালাতে না পারায় পেঁয়াজ পচে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। শুধু ফরিদপুর নয়, নাটোরসহ অনেক জেলা থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, সরকারও এখন এই প্রযুক্তিকে বড় পরিসরে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর রশিদ জানান, পেঁয়াজ ও রসুন উৎপাদনকারী এলাকাসহ সারা দেশে ৮,০০০ এয়ারফ্লো মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প এ জন্য নেওয়া হয়েছে এবং সেটি তখন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনাধীন ছিল বলে মন্ত্রী জানান।
জানতে চাইলে পেঁয়াজ সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. মাহফুজুর রহমান দাবি করেন তার প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। আমার দেশকে তিনি বলেন, এর দুটি অংশ। একটি কৃষি প্রণোদনার আওতায় এবং অন্যটি জলবায়ু তহবিলের অধীনে প্রকল্প। কৃষি প্রণোদনার অধীনে স্পেসিফিকেশন ছিল ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ ওয়াট মোটর। পরবর্তী সময়ে সেটা বাড়িয়ে ৪০০ ক্ষেত্রবিশেষে ৭৪৬ ওয়াট পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হলেও কৃষক ৩০০ মণের মতো পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবে। এর আগে ৩০০-৩৫০ ওয়াটের মোটর সংবলিত এয়ারফ্লো মেশিনে অর্ধেক সংরক্ষণ করা যেত।
তিনি বলেন, দেশের ১৫টি কোম্পানির সঙ্গে পরামর্শ করে ১২টি থেকে মোটরসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ নেওয়া হয়েছে। দুই বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সোলারে রূপান্তরে কোনো সমস্যা হবে না বলেও জানান পিডি মাহফুজ। তিনি বলেন, সোলারে কনভার্ট করা হলেও সমস্যা হবে না।
তবে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এয়ারফ্লো মেশিন প্রকল্পের উদ্ভাবক ও সরেজমিন উইংয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) কৃষিবিদ ড. জামাল উদ্দীন। আমার দেশকে তিনি বলেন, মেশিনের নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন ছিল ৩০০-৩৫০ ওয়াট। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কিছু মেশিনে ৪০০-৭০০ ওয়াটের মোটর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭৪৬ ওয়াটের মোটর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, শুধু মেশিন চালিয়ে বা ফাঁকা অবস্থায় ফ্যান ঘুরিয়ে মোটরের ক্ষমতা যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। তাই পেঁয়াজের ওপর লোড থাকা অবস্থায় মেশিন পরীক্ষা করতে হবে। তিনি দাবি করেন, এভাবে পরীক্ষা করলে ৪৫০, ৫০০ এমনকি ৮০০ ওয়াট পর্যন্ত রিডিং পাওয়া যেতে পারে। তাই শুধু ফাঁকা অবস্থায় ফ্যান ঘুরিয়ে পরীক্ষা না করে পেঁয়াজের স্তূপের ভেতর প্রকৃত লোডে মেশিন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে সরকারি সহায়তায় দেওয়া প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত কৃষকের জন্য বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, অভিযোগ শুনলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।