রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্সের কৃতিত্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার।
তার দাবি, অ্যাম্বুলেন্সটির জন্য তিনি ছাত্রশিবিরের আগে সংশ্লিষ্ট দাতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং রাকসুর পক্ষ থেকে আবেদনও করেছিলেন। তবে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এটিকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া উপহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অ্যাম্বুলেন্সটি হস্তান্তর করা হয়।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।’
রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান জাহিদও অ্যাম্বুলেন্সটি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
এরপর দুপুর দুইটার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে সালাহউদ্দিন আম্মার লিখেছেন, ৬ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (জকসু) অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার পর দাতা চিকিৎসক এস এম খালিদুজ্জামানের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। তিনি তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটি অ্যাম্বুলেন্স ও কিছু মেডিকেল সরঞ্জাম দেওয়ার অনুরোধ করেন।
আম্মারের দাবি, তিনি খুলনার পাইকগাছার বাসিন্দা হওয়ায় খালিদুজ্জামানের সঙ্গে তার আগে থেকেই পরিচয় ছিল।
আম্মার আরও লিখেন, ১৭ আগস্ট খালিদুজ্জামান তাকে ফোন করে জানান তার স্ত্রী লতিফা রশিদ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের অনুমোদনের মাধ্যমে রাবির জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরে জটিলতা হতে পারে আশঙ্কা করে তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক রাখার চেষ্টা করেন। যে তারিখে আবেদন করতে বলা হয়েছিল, সে অনুযায়ী রাকসুর জিএস হিসেবে তিনি আবেদনপত্রও দেন বলে দাবি করেন।
তার দাবি, ২১ আগস্ট তিনি ঢাকায় গিয়ে খালিদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাবির শিক্ষার্থীরা একটি অ্যাম্বুলেন্স পেতে যাচ্ছেন বলে পোস্ট দেন।
রাকসুর সদস্যদের জানানোর প্রসঙ্গে আম্মার লিখেছেন, ২১ আগস্ট আমি রাকসু গ্রুপে ম্যাসেজ দিয়ে জানাই যে আমরা একটা অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছি। আমি ভিপি ছাড়া আর কাউকে নাম বলিনাই কারণ নোংরামি হবে আমি জানতাম এটা নিয়ে কিন্তু ভিপি যেহেতু আমার উপরে আছেন এজন্য আমার তাকে জানানো প্রটোকলের মধ্যেই পড়ে। ইভেন আমি ভিপি ভাইকে বলেছি- আপাতত কাউকে না জানাতে এটা কেন আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। হুট করে দেখলাম ০৭ সেপ্টেম্বর শিবির ঘোষণা দিলো যে শিবিরের সভাপতি অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করেছেন। আমি পরে ভিপিকে নক দিয়েছি কোনো উত্তর পাইনি।
আম্মার আরও লেখেন, আমি ছাগলের ৩ নাম্বার বাচ্চার মতো ফটোসেশন করতে যাবো না, শিক্ষার্থীদের অ্যাম্বুলেন্স দরকার ছিল তারা পেয়েছে শুকরিয়া। কিন্তু আপত্তি করতাম না বা চুপচাপ থাকতাম যদি এটা বলা হতো রাকসুর পক্ষ থেকে উপহার। কিন্তু এটাতে লিখেছে শিবিরের পক্ষ থেকে উপহার। আপনাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় এটা। এখন বলতে পারেন আপনাদের শিবিরের অ্যালামনাই উনি কিন্তু আমি আপনাদের চ্যালেঞ্জ দিলাম রাবি শিবির সভাপতি, রুয়াসহ পুরো জামায়াত এবং শিবিরকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললাম, আমার আগে কেউ খালিদ সাহেবের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের অ্যাপ্রোচ করেছে একটা প্রমাণ দিতে পারলে আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে দেবো।
তিনি লেখেন, এই অ্যাম্বুলেন্সসংক্রান্ত একটা ফোনকল, একটা কনভার্সেশন দেখাক। ব্যাকডেটে একটা অ্যাপ্লিকেশনে সিগনেচার করে নিতে পারে সর্বোচ্চ। তবে আমার কাছে রিয়েল টাইম কনভার্সেশন আছে। আমি এটা নিয়ে তর্ক করতে চাই না তবে এই অ্যাম্বুলেন্স শিক্ষার্থীরা পেয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। রাকসুর থেকে শিবিরের ব্যানারকে বেশী গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই রাকসু নিয়ে এত হতাশা। যা কুড়িয়ে বাড়িয়ে আনে সেটাও শিবিরের নামে যায় তাহলে আর কী!
এ বিষয়ে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ‘২০২৪ সালের শুরুর দিকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহারেও মেডিকেল-সংক্রান্ত বিষয়টি ছিল। সেখান থেকেই আমাদের পক্ষ থেকে সভাপতির মাধ্যমে চিকিৎসক এসএম খালিদুজ্জামানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও কেউ একজন এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে তিনি নিজেই আমাদের সভাপতিকে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার বিষয়ে জানান। আমরা বলেছিলাম, এটি তো আমরা আগে থেকেই চাচ্ছি এবং এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমাদের কথাবার্তাও হয়েছে।’
কে আগে যোগাযোগ করেছেন সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন উল্লেখ করে মেহেদী হাসান বলেন, ‘কে আগে যোগাযোগ করেছে বা কে আগে অ্যাপ্রোচ করেছে, সেটা আমাদের জানা নেই। আমাদের ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি নিজেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি (আম্মার) তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না, সেটা আমাদের জানা সম্ভব নয়। তার সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ বা লিংকআপ নেই।’
রাকসুর জিএস আম্মার বলেন, ‘আমি তো সকল এভিডেন্স দিয়েই দিলাম এখন ওরা যদি গায়ের জোরে সত্য কে মিথ্যা আর মিথ্যা কে সত্য বানাতে চায় তাহলে তো আর আমার কিছু করার নাই।’
এ বিষয়ে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটি কে দিয়েছে, সেটি মুখ্য বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবায় এটি কাজে লাগবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরকে সহযোগিতা করবে, এটা স্বাভাবিক বিষয়। পাশাপাশি সালাউদ্দিন আম্মার যদি আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স দিতে পারেন, তাহলে সেটিও শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হবে এবং এতে তারা উপকৃত হবে।’
অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তরের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রশীদ, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এএইচএম খুরশীদ আলম, রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল ও সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।