জীবনভিত্তিক ছড়াকাব্য ‘টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটি’। এটি সম্পাদনা করেছেন মোহাম্মদ হারুন রশিদ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সম্পাদিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্ট অব ইন্টিলিজেন্স ব্রাঞ্চ’– এর প্রকাশনায় যুক্ত ছিলেন তিনি। আবার ২০১৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বিদেশি ভাষার বইয়ের বিবলিওগ্রাফিক্যাল ডাটা তৈরির কাজও করেছেন হারুন রশিদ।
বাংলা একাডেমির গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হারুন রশিদ নিজেকে পরিচয় দিতেন ‘বঙ্গবন্ধু গবেষক’। অথচ তাঁকেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবনীগ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশনা কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজন। তাদের ভাষ্য, হারুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী দাবি করে গর্ববোধ করতেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করে, এখন আবার জিয়াউর রহমান বিষয়ে গবেষক হচ্ছেন। একই ব্যক্তির দুই চরিত্রে যুক্ত হওয়া বিস্ময়ের।
কবি ও সংগঠক মোহাম্মদ রোমেল বলেন, ‘হারুন রশিদ বাদে বাংলা একাডেমিতে উপযুক্ত কেউ থাকলে তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত ছিল। বড় বিষয় বাংলা একাডেমিতে তো কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। আগের লোকজনই রয়ে গেছে। হয়তো এর বাইরে ভালো কেউ নেই।’
সূচীপত্র প্রকাশনের প্রকাশক সাঈদ বারী স্ট্রিমকে বলেন, কমিটির কথা শুনেছি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনী লেখার কমিটিতে এমন লোক এলে, তার দায় বাংলা একাডেমির।
লেখক ও সাংবাদিক আবিদ আজম বলেন, আমলারা সব সময় সব সরকারের হয়ে কাজ করেন। আওয়ামী লীগের সময় হারুন আওয়ামী লীগার হয়েছেন, এখন বিএনপি হচ্ছেন। সামনে অন্য কেউ সরকারে, তার পক্ষে কাজ করে চাকরি বাঁচাবেন তিনি।
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট নাঈম আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, বঙ্গবন্ধু গবেষককে দিয়ে জিয়াউর রহমানের জীবনী লেখানো হচ্ছে, ভেবেই ভয় লাগছে।
হারুনের বঙ্গবন্ধুবিষয়ক কর্মযজ্ঞ
২০১৬ সালের ১ জুন ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে’ বিবলিওগ্রাফিক্যাল ডাটা তৈরির কাজ দেওয়া হয়েছিল হারুন রশিদকে। সেখানে স্বাক্ষর ছিল বাংলা একাডেমির প্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিভাগের তৎকালীন পরিচালক ডা. কেএম মুজাহিদুল ইসলামের।
এছাড়া তপন কুমার দের বই ‘স্মৃতি ও চেতনায় বঙ্গবন্ধু’ বইয়ে হারুন রশিদ ‘স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদান’ নামে প্রবন্ধ লিখেছেন। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবননির্ভর ছড়াকাব্য ‘টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটি’ বই সম্পাদনা করেছেন তিনি।
২০২২ সালের ২ নভেম্বর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, শেখ হাসিনা সম্পাদিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টিলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য ন্যাশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক বইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন হারুন রশিদ। এতে নিজেকে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের একজন পরীক্ষিত অনুসারী এবং বর্তমান সরকারের একজন অনুগত কর্মচারী’ উল্লেখ রয়েছে।
জানতে চাইলে হারুন রশিদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিগত প্রায় ১৪ বছর আমাকে ওএসডি করে রাখা হয়। আমার বিরুদ্ধে তখন লিখিত অভিযোগ আনা হয়েছিল—আমি সংস্থায় বসে বঙ্গবন্ধুকে গালিগালাজ করি। আওয়ামী লীগের আমলে যারা অবৈধভাবে ১৮০-২০০ লোক নিয়োগ দিয়ে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে, তারাই মূলত এখন আমার বিরুদ্ধে লেগেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ কোনো দিন আওয়ামী লীগ করেনি। যশোরের মনিরামপুরে আমার পরিবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। পরিবারের সদস্যরা বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বেও আছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে হারুন রশিদ বলেন, ‘বলা হচ্ছে আমি বঙ্গবন্ধুর গবেষক। এটি পুরোপুরি অসত্য। টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটি বইয়ের লেখক আমি নই। আওয়ামী লীগ আমলে একজন এটি লিখে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে আমার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। আমি শুধু একটি পৃষ্ঠা সম্পাদনা করেছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদান’ শিরোনামে যে নিবন্ধের কথা বলা হচ্ছে, তা আমি লিখেছিলাম চাকরি বাঁচানোর জন্য। এরপরও তৎকালীন প্রশাসনের রোষানলে পড়ে চাকরিচ্যুত হওয়া ঠেকাতে ২০২২ সালে আমাকে হাইকোর্টে রিট করতে হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের জীবনী প্রকল্পের বিষয়ে হারুন রশিদ বলেন, ‘২০০২-০৩ সালে বাংলা একাডেমি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবনী রচনার উদ্যোগ নিলে, তখনই আমি যুক্ত হই। বর্তমানে আমি গবেষণা ও সংকলন বিভাগের পরিচালক। পদাধিকারবলে এই বিভাগ থেকে প্রকাশিত যেকোনো বইয়ের প্রকাশনা কমিটির সদস্য আমি।’
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেও মন্তব্য পায়নি স্ট্রিম। তবে একাডেমির সচিব (উপসচিব) সেলিম রেজা বলেন, ‘উনাকে (হারুন রশিদ) জীবনীগ্রন্থ লেখা বা সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বেশ আগে। এটি আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই। এই বিষয়ে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলছে। কাজটা শেষের পথে। একাডেমি হয়তো পরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে লেখক বা সম্পাদনা পর্ষদের সবাই সরকারসমর্থক। মূল কাজটা তারাই করছেন, হারুন রশিদ বিষয়টি সমন্বয় করছেন।