Image description

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বর্তমান কাঠামো আট দশক আগের বাস্তবতায় তৈরি এবং এখন বিশ্বের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, পাঁচটি দেশের সিদ্ধান্তের ওপর ১৯০টিরও বেশি দেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয় এবং এতে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে পড়ছে।

 

ভেটো ক্ষমতা কী

 

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন স্থায়ী সদস্য। তাদের বিশেষ ক্ষমতার নাম ‘ভেটো’। নিরাপত্তা পরিষদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের পক্ষে ১৫ সদস্যের ১৪টি ভোট থাকলেও এই পাঁচ দেশের যেকোনো একটি ‘না’ ভোট দিলে প্রস্তাবটি আটকে যায়।

 

এই ক্ষমতা নিয়েই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্ক বেড়েছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আটকে দিয়েছে রাশিয়াও। ফলে আন্তর্জাতিক সংকটের সময় নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না এমন সমালোচনাও জোরালো হয়েছে।

 

 

এরদোয়ান আসলে কী চান

 

এরদোয়ানের প্রস্তাব শুধু ভেটো বাতিলেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের পুরো কাঠামো পুনর্গঠনের কথা বলেছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থায়ী সদস্যপদের ব্যবস্থাও তুলে দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত করা।

 

এরদোয়ান মনে করেন, এতে সদস্য দেশগুলোকে সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের আস্থা অর্জন করেই নিরাপত্তা পরিষদে আসতে হবে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পাঁচটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত না থেকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করবে।

 

ভেটো ক্ষমতা কি সত্যিই বাতিল হতে পারে

 

আইনগতভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত কঠিন। ভেটো বাতিল করতে জাতিসংঘ সনদ সংশোধন করতে হবে। সনদের ১০৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রথমে সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন। এরপর দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যরাষ্ট্রকে সংশোধনী অনুমোদন করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাঁচ স্থায়ী সদস্যকেও সেটিতে সম্মতি দিতে হবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে নিজেদের বিশেষ ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে রাজি হতে হবে। এ কারণেই প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো যাদের ক্ষমতা বাতিল করার কথা, তাদেরই সম্মতি প্রয়োজন।

 

বিকল্প হিসেবে কী প্রস্তাব আছে

 

ভেটো পুরোপুরি বাতিলের পরিবর্তে ফ্রান্স ও মেক্সিকো ২০১৫ সালে একটি উদ্যোগ নেয়। এতে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে স্বেচ্ছায় ভেটো ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যোগটি আবার গতি পেয়েছে। গত চার মাসে যুক্তরাজ্যসহ ২১টি দেশ এতে সমর্থন দিয়েছে। সব মিলিয়ে ১২৮টি জাতিসংঘ সদস্যরাষ্ট্র এই উদ্যোগের পক্ষে রয়েছে বলে ফরাসি সরকার জানিয়েছে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়, ফলে স্থায়ী সদস্যরা চাইলে তা মানতে নাও পারে।

 

 

স্থায়ী সদস্য বাড়ানোর সম্ভাবনা কি বেশি

 

ভেটো বাতিলের চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর আলোচনা তুলনামূলকভাবে বেশি। রাশিয়া ভেটো ক্ষমতা বজায় রাখার পক্ষে থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য বাড়ানোর কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও সীমিত পরিসরে পরিষদ সম্প্রসারণের বিষয়ে অতীতে সমর্থন জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আফ্রিকার দেশগুলোর পাশাপাশি ব্রাজিল, জার্মানি, ভারত ও জাপানকে স্থায়ী সদস্য করার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।

 

তবে নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হবে। জাতিসংঘ সনদ সংশোধনে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সম্মতি লাগবে। আর নতুন সদস্যরা ভেটো ক্ষমতা পাবে কি না, কোন দেশ স্থায়ী সদস্য হবে এসব নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ফলে এরদোয়ানের প্রস্তাব বিশ্বব্যাপী বিতর্ক উসকে দিলেও, নিরাপত্তা পরিষদের ৮০ বছরের কাঠামো বদলানো এখনো কঠিন রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়।

 

(আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)