Image description

বয়স বাড়ার সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে—এমন ধারণা বদলে গেছে। বর্তমানে ২৫-৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সিদের মধ্যেও বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক ও হৃদরোগের প্রবণতা। এ বয়সের অনেকেই ধমনিতে ব্লকেজ কিংবা গুরুতর হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। দেশে হৃদরোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজধানীর সরকারি একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যুও।

হৃদরোগ হাসপাতালের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় এখানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬৯৪ জন, প্রতিদিন গড়ে ২৩ জন মারা গেছেন এবং জরুরি বিভাগে মাসিক গড় প্রায় ১৭ হাজার ৩১১ (প্রতিদিন গড়ে ৫৭০) জন চিকিৎসা নিয়েছেন। আর বহির্বিভাগে মারা যান প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৭ হাজার ২৮১ জন, যা প্রতিদিন গড়ে ১,৫৫৭ জন এবং প্রতি মাসে গড়ে ভর্তি হচ্ছেন প্রায় ১০ হাজার ২৩০ জন, যা প্রতিদিন গড়ে ৩৩৭ জন। যদিও দেশে প্রতি বছর হৃদরোগে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা, এ রোগে কতজন ভুগছেন, হৃদযন্ত্রের ত্রুটি নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

বিজ্ঞাপন

হৃদরোগের চিকিৎসকদের ধারণা, দেশে প্রতি বছর মারা যান ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ। আর বছরে আক্রান্ত হন প্রায় ১০ লাখ। বর্তমানে দেড় কোটির বেশি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত। আর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই হৃদরোগজনিত কারণে। আর প্রতি পাঁচজনের একজন রয়েছেন অকাল হৃদরোগের ঝুঁকিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। বংশগত প্রবণতার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, অতিরিক্ত উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা ও মানসিক চাপসহ নানা কারণে তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই, ২৫ বছর বয়সের আগেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বিশ্ব হৃদরোগ দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’। অর্থাৎ, প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন। এর দ্বারা বার্তা দেওয়া হয়েছে—‘সতর্কতামূলক লক্ষণ উপেক্ষা না করি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও হার্টের যত্ন নিই।’

 

জানা গেছে, যেকোনো সময়ের তুলনায় হৃদরোগ শনাক্তের পরীক্ষা এখন দেশে বেশি হচ্ছে। কিন্তু জেলা পর্যায়ের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষায়িত সেবা নেই। ফলে ঢাকার বাইরে থাকা রোগীদের অনেককেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগানো—দুই দিক থেকেই তাদের সংকটে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে হৃদরোগের চিকিৎসায় রাজধানীর ওপর বাড়ছে রোগীর চাপ।

City& Local Guides

 

সরেজমিনে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে দেখা গেছে, এখানে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং চিকিৎসক কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের। করিডোর, পথঘাট ও ফ্লোরে বসে থাকতে দেখা গেছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ভোগান্তি আরো তীব্র হয়।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৯০ জন। একই সময়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন তিন লাখ ৭৮ হাজার ২৪৪ জন। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮১ হাজার ৮৪১ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫,৫৫২ জন।

এর আগের বছর ২০২৫ সালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এক লাখ ৮৯ হাজার ৭০৩ জন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই লাখ ২৭ হাজার ৫০৬ জন। আর ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ২১ হাজার ৩১৯ জন। মারা গেছেন ৭,৩৪৮ জন। ২০২৪ সালে জরুরি বিভাগে এক লাখ ৭০ হাজার ৮৯৭ জন, বহির্বিভাগে দুই লাখ ৭২ হাজার ২৬০ জন, ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৭,২১৫ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৭,১৪৭ জন।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০টি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার হচ্ছে। হৃদরোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় এনজিওগ্রাম, স্টেন্ট (রিং) স্থাপন, বাইপাস সার্জারি ও ক্যাথল্যাবের মতো সুবিধা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে এসব চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

আবার বেসরকারি পর্যায়ে খবচ সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আর্থিকভাবে সচ্ছল রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য নেই তাদের মোট রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশই এই হাসপাতালে সেবা নেন।

বিশ্ব হৃদরোগ দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) এর সহায়তায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত ‘তরুণদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেট : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে জানানো হয়, বিশ্বে প্রতি বছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করেন, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশেও হৃদরোগজনিত মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগে।

History

 

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা অন্যতম। এ ব্যথা ধীরে ধীরে চোয়াল, বাম কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ আমার দেশকে বলেন, এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষত তরুণদের মধ্যে পারিবারিক ইতিহাস ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং পরিবেশগত নানা কারণ তরুণদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশেও রক্তনালিজনিত সমস্যা, চর্বি ও উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের কারণে দিনদিন হৃদরোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। কারণ হৃদরোগের সঙ্গে এগুলো জড়িত। তাই হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ও অ্যালকোহল ত্যাগ করার পাশাপাশি অল্প বয়স থেকেই স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে হবে।