Image description

তিস্তায় জাল ফেলেও মেলে না মাছের দেখা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল টেনে অনেক সময় প্রায় খালি হাতেই ফিরতে হয় জেলেদের। অথচ একসময় এই নদীই ছিল তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

তিস্তায় মাছ কমে যাওয়ায় এখন পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন জেলারা। কেউ দিনমজুরি করেন, কেউ কৃষিশ্রমিক আবার কেউবা কাজ করেন ইটভাটায়। এমনকি অটোরিকশা চালিয়ে অথবা অন্যের পুকুরে মাছ ধরেও জীবিকা নির্বাহ করেছেন কেউ কেউ। এমনকি কাজের সন্ধানে ঢাকায়ও যেতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তাতীরবর্তী তিন ইউনিয়নে এমন অনিশ্চয়তায় রয়েছে ৬৮৬টি নিবন্ধিত জেলে পরিবার। উপজেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ১৭৫, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় ৩৮০ এবং নাজিমখানে ১৩১টি জেলে পরিবার রয়েছে। পুরো উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭।

স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেও তিস্তায় রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, চিতল, পাবদা, টেংরা, বাচা, বাতাসি, পুঁটি, মলা, চেলা, কাচকি ও চাঁদাসহ ৪০ থেকে ৪৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বড় মাছের পাশাপাশি ছোট দেশীয় মাছও ছিল প্রচুর। এখন এসব মাছের অনেক প্রজাতিই আগের তুলনায় কমে গেছে।

সিংগার ডাবরীহাট এলাকার জেলে মানিক বলেছেন, ‘আগোত তিস্তাত ৪০-৪৫ রকমের মাছ পাওয়ায় গেইছিল। এলা অইগুলা মাছ চোখোতেই পড়ে না। নদীত মাছ মারি সংসার চালানো কঠিন অইছে।’

বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাড়ামৌলা এলাকার জেলে আব্দুল জলিল বলেছেন, ‘আগে নদীত মাছ মারিই সংসার চলছিল। এলা মাছ নাই, তাই অন্যের জমিত কাম করি। কাম না থাকলে ঢাকাত যাই।’

তৈয়বখাঁ মৌজার জেলে বিজয়ও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় মাছ ধরার ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই কখনো কৃষিকাজ, কখনো অন্য কাজ করে সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে।

শুধু মাছের পরিমাণ নয়, তিস্তার নদীচিত্রও বদলে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। তাদের ভাষ্য, বালু ও পলি জমে অনেক জায়গায় নদীর নাব্য কমেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বড় অংশ শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়। কোথাও কোথাও নদীর মূল প্রবাহ সরু হয়ে গেছে। এতে মাছের বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের উপযোগী জায়গাও কমে যাচ্ছে। জেলে মতিন মিয়া বললেন, ‘আগের মতো এলা তিস্তা নাই। ভাঙতে ভাঙতে নদী পাল্টি গেছে। মাছ থাকার জাগা নাই, ডিম দেওয়ার পরিবেশও নাই। ডিম না থাকলে মাছ হইবে কোটে থাকি?’

কাশেম বাজারের জেলে মোজাম্মেল ও আফজাল বলেছেন, ‘ঝড়ির দিনোত পানি বাইড়লে মাছ হয়, তখন নদীত যাই। এলা পানি কমি গেছে, মাছও নাই। তাই মাইষের ডিগিত মাছ মারি দেই। এক খ্যাওয়ে ৩০০ টেকা দেয়, ওই টেকাতেই কোনোমতে চলি।’

জেলেরা বলছেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় তাদের পাশাপাশি স্থানীয় বাজার ও মাছের ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়েছে। আগে নদী থেকে ধরা মাছ স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি হতো। এখন অনেক জেলেকে মাছ ধরার জন্য দূরের নদী বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তিস্তায় মাছের বৈচিত্র্য নিয়ে প্রকাশিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব ফিশ বায়োডাইভারসিটি ইন দ্য তিস্তা রিভার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, পলি ও বালু জমে নাব্য কমে যাওয়া, পানির গভীরতা ও স্রোত কমে যাওয়া, দূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং মাছের চলাচলে বাধার কারণে তিস্তায় মাছের আবাসস্থল হুমকিতে পড়েছে। গবেষণায় তিস্তাকে মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল, প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেছেন, নদীদূষণ, নাব্য কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজননের অনুকূল সময় ও পরিবেশ কমে যাচ্ছে। এর ফলে মাছের উৎপাদন কমছে এবং সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলেদের জীবিকায়।