সংবিধান সংস্কার না সংশোধন; এই বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে গণভোটের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সংবিধানের মৌলিক বিষয়ে সংশোধন আনা হলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় আবারও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। আগামী জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করা হতে পারে। বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সইয়ের আগে যেসব বিষয়ে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব করা গণভোটের কোনও মিল নেই বলে মনে করছেন বিরোধী দলের নেতারা ও কয়েকজন রাজনীতিবিদ। তাদের অভিযোগ, সরকার জুলাই সনদের জনরায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের নামে নতুন প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক গণভোট সাধারণ গণভোটের মতো নয়। সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিধানে পরিবর্তন আনা হলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে।
বিরোধী পক্ষ অবশ্য মনে করছে, বিএনপি নিজের সই করা জুলাই সনদ অস্বীকার করছে। মূলত নিজেদের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ভয়েই তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ তাদের।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দলীয় অনুষ্ঠানে এ নিয়ে মুখ খোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকার জনরায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের কথা বলে কালক্ষেপণ করতে চায়। নতুন করে গণভোটের কথা বলা সরকারের অপকৌশলেরই অংশ। কিন্তু দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অবশ্য মনে করেন, তারা যা করবেন, সংবিধানের সীমারেখার মধ্যেই করবেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন করে আসলে কোন গণভোটের কথা বলছেন? জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুযায়ী গণভোটের সঙ্গে এর মিল বা পার্থক্য কতটুকু? আর ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের রায়েরই বা কী হবে? সরকার যদি সত্যিই নতুন করে গণভোটের আয়োজন করে, তাহলে বিরোধী পক্ষ কী করবে; তা মেনে নেবে, নাকি প্রতিহত করবে? শেষ পর্যন্ত সরকারই বা কী করবে? এসব নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গণভোটের কথা অনুযায়ী সংবিধান পরিষদ গঠন করার কথা ছিল। সংবিধানের তত্ত্বাবধায়ক সুপ্রিম কোর্ট। এখন বিদ্যমান সংবিধান সুপ্রিম কোর্ট চাইলেই বাতিল করে দিতে পারে। তবে এ নিয়ে সরকার ও বিরোধীপক্ষ সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
তিনি জানান, সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারে ব্যর্থ হলে সমস্ত দায়দায়িত্ব বিএনপির ওপরই পড়বে। এতে সংকট বাড়তে পারে।
জুলাই সনদের গণভোট ও নতুন গণভোটের পার্থক্য কী?
জুলাই সনদ বিষয়ে গণভোট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব করা গণভোটের মধ্যে ভিন্নতা কী; এ নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করছেন কেউ কেউ। জুলাই সনদ প্রশ্নে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬১ শতাংশ ভোট পড়ে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে। কথা ছিল, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন তারা।
প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্ররা এই শপথও নেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও তাদের মিত্ররা সেদিন শপথ নেননি। বরং তারা সংবিধান সংশোধনের পক্ষেই অবস্থান নেন। সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিদ্যমান সংবিধানের ভেতরে থেকেই সব কিছুর পক্ষে মত দেন।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও তা অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাতীয় সংসদের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাসহ ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সংক্রান্ত। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দল বেশিরভাগই একমত। যদিও এসব প্রস্তাবের বেশ কয়েকটিতে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছিল।
তাহলে দুই গণভোটের পার্থক্য কী; এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত আবদুল কাইয়ূম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী জুলাই সনদের গণভোটের কোনও মূল্য নেই। তিনি মূলত সুপ্রিম কোর্টে পঞ্চদশ সংশোধনীর রিভিউর রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত গণভোটের কথা বলছেন। যা মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে ধারণ করা হয়েছিল।
তবে আমরা আরও ১৩৩ কার্যদিবসের মধ্যে গণপরিষদ গঠন করে সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছি। অথচ তারা সেই ৭২-এর সংবিধান নিয়ে আছেন। তাই তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করতে চান। তবে এ বিষয়ে তিনি এখনও আশাবাদী হতে চান বলে জানান।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বিরোধীপক্ষের অভিযোগ সঠিক নয়। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপি যেভাবে সই করেছে, সেভাবেই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিষয় বলা ছিল। সেটা আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উঠিয়ে দেয়। অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালত ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করতে আদেশ দিয়েছেন। মূলত এটাই সংবিধানে আসবে।
নতুন সংকট তৈরি হবে?
নতুন সরকারে গণভোটের আয়োজন সংবিধানবিরোধী না হলেও এর মাধ্যমে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটের রেওয়াজ অতীতেও ছিল। তাই সরকার যদি ৭২-এর বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী গণভোট করে, তাতে কোনও সমস্যা নেই।
তবে তিনি এও বলেন, সরকার যদি সব কিছুতেই সংবিধানকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে তো বলতে হবে তারাই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেনি। তাই একটি গণভোট কার্যকর না করে আরেকটির উদ্যোগ নিলে সংকট হতেই পারে। আবার সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ের ভিত্তিতে এটি হলে ভিন্ন কথা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের আগেই তারা বলেছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী গণভোট করে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদে বিল উত্থাপন করে পাস করার পর রাষ্ট্রপতির আদেশের পরই গণভোট দিতে হবে। কিন্তু তখন তো এমনটি করা হয়নি। তাই এই সরকার চাইলে তা করতে পারে।
তবে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সরকার হয়তো পঞ্চম সংশোধনীর মতো জিয়াউর রহমানের সংবিধানের মূলনীতি সংস্কার করবে। এই সময়ে বিরোধী দলসহ অন্যরা গণভোটের সিদ্ধান্ত মানবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর মাধ্যমে হয়তো নতুন সংকটও তৈরি হতে পারে। সে আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকার ও বিরোধী দলের ভিন্ন ব্যাখ্যা
সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে গণভোটের প্রস্তাবকে নাকচ করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অন্যতম মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা মনে করে, সরকার এমনটি করলে এটি হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার গণভোটের রায় অমান্য করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অথচ তারা নিজেরাও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। আমরা মনে করি, এখন নতুন করে গণভোটের কথা বলে তারা নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ম প্রকাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে আমরা জনগণের অধিকার আদায়ে লড়াই অব্যাহত রাখবো।
একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, সরকার নতুন করে গণভোটের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের মানুষ মেনে নেবে না। কারণ এটি সুস্পষ্ট প্রতারণা।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার সংবিধানের বাইরে কিছু করবে না। তবে গণভোট নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলেছিলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে বলতে হবে।