নিউইয়র্কে তখন সকাল। ম্যানহাটনের রাস্তায় একের পর এক গাড়ি ছুটছে, জায়গায় জায়গায় পুলিশের ব্যারিকেড ও কড়া নিরাপত্তা তল্লাশি। হোটেলের সামনে কালো কাচের গাড়ি এসে থামতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা মিলছে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা মন্ত্রীর। কয়েক ব্লক দূরে জাতিসংঘ ভবন। সেখানে সবকিছু নির্ধারিত আসন, সময় ও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ; বিশ্বনেতারা ক্যামেরার সামনে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু জাতিসংঘের এই চোখধাঁধানো মঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলেই পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, গবেষক এবং সাংবাদিকদের পদচারণায় নিউইয়র্ক এক অন্য রূপ নেয়। বিশ্বনেতারা সাধারণ বিতর্কে অংশ নিয়ে যুদ্ধ, শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তবে কেবল একটি ভাষণ দিয়ে কোনো দেশের কূটনীতি শেষ হয় না; আসল তৎপরতা শুরু হয় মঞ্চের ভাষণ শেষ হওয়ার পরই।
পর্দার অন্তরালে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি
জাতিসংঘের মঞ্চের আলো যেখানে নেভে, মাঠের সাংবাদিকতার মূল চ্যালেঞ্জ সেখানে শুরু হয়। ভাষণ শেষ করে বিশ্বনেতারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে—হোটেলের লবি, কূটনৈতিক মিশন কিংবা রেস্টুরেন্টের নৈশভোজে। সেখানে শুরু হয় বন্ধ দরজার ওপারে অপ্রকাশ্য বৈঠক। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সংকট, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য আলোচনার অনেক তথ্যই জনসমক্ষে আসে না; প্রকাশ পায় কেবল এক লাইনের সংক্ষিপ্ত বিবৃতি কিংবা একটি আনুষ্ঠানিক ছবি।
জাতিসংঘের অধিবেশন কাভার করতে গিয়ে মূল উপলব্ধি এটাই যে, সব খবর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে থাকে না। বরং বক্তব্যের পরের কয়েকটি ঘণ্টাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নেতা কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে কোন হোটেলে ঢুকছেন কিংবা বের হচ্ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সাংবাদিকদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটতে হয়।
ম্যানহাটনের হোটেল ও প্রবাসীদের রাজনৈতিক উত্তাপ
অধিবেশনের দিনগুলোতে ম্যানহাটনের বড় বড় হোটেলগুলো কার্যত অস্থায়ী কূটনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। গাড়ি থেকে নেমে কোনো নেতার দেওয়া মাত্র এক লাইনের তাৎক্ষণিক মন্তব্যই অনেক সময় দিনের সেরা সংবাদে পরিণত হয়। নেতাদের এই কূটনৈতিক ব্যস্ততার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবাসী রাজনীতি।
নিউইয়র্কে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাস করেন। নিজ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের আগমন ঘিরে প্রবাসী সমাজে সবসময় আলাদা উত্তাপ তৈরি হয়। সমর্থন, বিক্ষোভ কিংবা নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সফরটি সহজেই প্রবাসী রাজনীতির ময়দানে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্র বেশ স্পষ্ট। জাতিসংঘের ভেতরের আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি বাইরে প্রবাসী সমাজের রাজনৈতিক জমায়েত ও প্রতিক্রিয়ার ওপরও সংবাদকর্মীদের সমান চোখ রাখতে হয়।
সময়ের বিরুদ্ধে দৌড় ও ব্যবসার সুযোগ
জাতিসংঘ অধিবেশন কাভার করাটা একপ্রকার সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়। কোনো অনুষ্ঠান কখন শেষ হবে বা কখন কোন নেতা কোথায় উপস্থিত হবেন, তার নিশ্চয়তা থাকে না। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—কোন খবরটি ধরে রাখতে হবে আর কোনটি ছেড়ে দিতে হবে। বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো হয়তো বিশ্বশক্তির কূটনৈতিক বৈঠককে অগ্রাধিকার দেয়, তবে দেশীয় পাঠকদের কাছে প্রবাসীদের ছোট ঘটনার গুরুত্বও কম নয়।
এর পাশাপাশি অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ব্যবসা ও বিনিয়োগের বড় সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিনিধি দলগুলো নতুন বাজার এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় বসে। একদিকে জাতিসংঘের মঞ্চে নীতিগত ভাষণ চলে, অন্যদিকে হোটেলের টেবিলে চলে বাস্তব অংশীদারিত্বের রূপরেখা।
মঞ্চ কেবল দৃশ্যমান অংশ
দিনের নির্ধারিত সূচি শেষ হলেও নিউইয়র্ক থমে যায় না। রাতের কূটনৈতিক রিশেপশন, সাইড ইভেন্ট ও নৈশভোজের টেবিলেই প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগটি তৈরি হয়। আজ যে আলোচনার খবর মাত্র কয়েক লাইনে দেখা গেল, সপ্তাহ বা মাস খানেক পর তা পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ নিতে পারে।
জাতিসংঘ অধিবেশন শেষ হলে নেতারা ফিরে যাবেন, নিরাপত্তা শিথিল হবে, ম্যানহাটন স্বাভাবিক হবে; কিন্তু কয়েক দিনে তৈরি হওয়া এই পর্দা পেছনের যোগাযোগগুলো রয়ে যায়। জাতিসংঘ ভবনটি কেবল মূল আয়োজনের একটি দৃশ্যমান মঞ্চ। আসল ক্ষমতার সংযোগগুলো ছড়িয়ে থাকে ম্যানহাটনের রাস্তা, হোটেলের লবি, গোপন বৈঠক আর ক্যামেরার আড়ালে থাকা নির্জন করিডোরে। মঞ্চে বিশ্ব কথা বলে, আর মঞ্চের বাইরে সেই কথার আসল অর্থ ও ভবিষ্যৎ পরিণতি খুঁজে বের করে নিউইয়র্ক। এটাই জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আরেক পৃথিবী।