Image description

ছোট কিংবা সমীক্ষা প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পরামর্শক খাতে রাখার নজির আছে। তবে, এবার ঘটেছে অনেকটা ‘বিরল’ ঘটনা। অনুদানভিত্তিক একটি প্রকল্পের শতভাগ অর্থই চেয়ে বসেছে দাতা দেশের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এমন ‘অযৌক্তিক’ প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

‘টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স প্রজেক্ট ফর ডিটেইলড ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড ডিজাইন অব ডাঙ্গা বাজার ব্রিজ আন্ডার রোডস অ্যান্ড হাইওয়েস ডিপার্টমেন্ট (আরএইচডি), বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ঘটেছে এমনটি।

কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১ কোটি ২৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর শতভাগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের পকেটে নিতে চায়। এটি একটি টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রকল্প প্রস্তাব (টিএপিপি)। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পের পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর ডাঙ্গা বাজার সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডি ও ডিটেইলড ডিজাইন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচ্য টিএপিপি প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পের পুরোটাই অনুদান দেবে স্প্যানিশ এফআইইএম (ফন্ডো পারা লা ইন্টারন্যাশনালাইজেশন ডি লা ইম্প্রেসা)। এটি স্পেনের একটি সরকারি আর্থিক তহবিল বা করপোরেট আন্তর্জাতিকীকরণ তহবিল।

তবে মজার বিষয়, স্পেনের সংস্থাটি নামেই বাংলাদেশকে অনুদান দিচ্ছে। পুরো টাকাই তারা পরামর্শক খাতে ব্যয় দেখাবে। মানে এখানে দেশি কোনো পরামর্শকের কাজ করার সুযোগ নেই। অনুদান দিয়ে নতুন করে দেশে চড়া সুদে ঋণের ফাঁদও পেতেছে সংস্থাটি।

প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত নির্ধারণ করে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রস্তাবিত ২১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সম্পূর্ণটাই পরামর্শক খাতে ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে পরামর্শকের সংখ্যা আরও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন বলে আলোচনা হয়েছে।

এছাড়া টিএপিপিতে সংযুক্ত ক্রয় পরিকল্পনা যথাযথ হয়নি। বিস্তারিত আলোচনা করে প্রকল্পের আওতায় পরামর্শকের সংখ্যা ও ধরন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুসরণ করে ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়েও এসপিইসি সভায় একমত পোষণ করা হয়।

প্রকল্পের আওতায় পরামর্শকের সংখ্যা, ধরন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করে প্রকল্প পুনর্গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পিপিআর-২০২৫ অনুসরণ করে ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। দেশের জন্য সেটাই করতে হবে। আমার জ্ঞানে যেটা ভালো মনে হয়েছে সে সব বিষয়েই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।-পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় পরামর্শকের সংখ্যা, ধরন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করে প্রকল্প পুনর্গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পিপিআর-২০২৫ অনুসরণ করে ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। দেশের জন্য সেটাই করতে হবে। আমার জ্ঞানে যেটা ভালো মনে হয়েছে সে সব বিষয়েই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈদেশিক অনুদানের নিশ্চয়তার বিষয়ে ইআরডির প্রতিনিধির মতামত জানতে চায় কমিশন। এ প্রসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানায়, প্রকল্পের জন্য অনুদান দেওয়ার বিষয়ে স্পেন সরকার ইমেইলের মাধ্যমে আগ্রহ প্রকাশ করলেও এখনো কোনো অনুদান বা অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি।

প্রস্তাবিত অনুদানভিত্তিক এ প্রকল্পের টিএপিপি নীতিগতভাবে অনুমোদনযোগ্য। স্প্যানিশ এফআইইএম মূলত স্পেন সরকারের একটি অর্থায়ন ইন্সট্রুমেন্ট, ঋণের ক্ষেত্রে এই ইন্সট্রুমেন্টটির সুদের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। কাজেই বিবেচ্য অনুদান গ্রহণে ভবিষ্যতে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করবে কি না সেটি বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কমিশন জানায়, প্রকল্পের সমীক্ষা সংক্রান্ত প্রস্তাবিত টিএপিপি অনুমোদন করা হলেও এর আওতায় ভবিষ্যতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ জরুরি। দেশের জন্য নমনীয় ঋণকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পে প্রস্তাবিত অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সুবিধাজনক শর্তে, বিশেষত নমনীয় ঋণকে প্রাধান্য না দিয়ে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করবে কি না সে বিষয়ে ইআরডি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ স্পেন সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে মত দিয়েছে কমিশন।

একইসঙ্গে প্রস্তাবিত অনুদান গ্রহণ সঙ্গতিপূর্ণ হলে প্রকল্প প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণের জন্য নেগোসিয়েশন পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত সংস্থা থেকে অনুদান গ্রহণে ভবিষ্যতে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে কি না- ভেবে দেখার সুপারিশ করেছে কমিশন।

প্রকল্পের এসপিইসি সভায় অংশ নেওয়া ভৌত অবকাঠামো বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টিএপিপিতে পরামর্শক সেবা সংশ্লিষ্ট ভ্যাট ও ট্যাক্সের সংস্থান রাখা হয়নি। এ বিষয়ে সওজ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি বলেন, আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় স্পেন সরকারের পক্ষ থেকে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। পরামর্শক সেবার যাবতীয় ব্যয় বহন করবে দেশটির সরকার। বিস্তারিত আলোচনার পরে প্রস্তাবিত টিএপিপিতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ না থাকলেও ভবিষ্যতে ভ্যাট-ট্যাক্স অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টিএপিপি পুনর্গঠন করা হবে।

টিএ প্রকল্পগুলো সাধারণত এমনই হয়। সেজন্য ২১ কোটি টাকা তারাই পুরোটা খরচ করবে। এখানে আমাদের দেশি পরামর্শক থাকার সুযোগ নেই।-সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান

সওজ জানায়, ডাঙ্গা বাজার সেতুটি অবস্থানগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর পাঁচদোনা-ভাঙ্গা-ঘোড়াশাল মহাসড়কের (জেড-২০৪৭) ডাঙ্গা বাজার নামক স্থানে সেতুটি নির্মিত হলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে যাতায়াত সুগম হবে। এছাড়া, সেতুটি নির্মিত হলে গাজীপুর থেকে আসা যানবাহন ডাঙ্গা বাজার সেতু ব্যবহার করে পাঁচদোনা-ডাঙ্গা-ঘোড়াশাল এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধ্যমে সিলেটে সহজে যাতায়াত করতে পারবে।

শীতলক্ষ্যা নদীর বাম তীরে নরসিংদী এবং ডান তীরে নারায়ণগঞ্জ অবস্থিত হলেও দুই অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ না থাকায় এই দুই শিল্পাঞ্চলের মধ্যে ভারী যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই সেতুর অবস্থান, নদীর নাব্য ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি দীর্ঘ স্প্যান বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।

আলোচ্য প্রকল্পটির মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ডাঙ্গা বাজার সেতু ও সেতু সংলগ্ন অ্যাপ্রোচ সড়কের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ডিজাইন করা। বিস্তারিত আলোচনা করে প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা পুনর্গঠিত টিএপিপিতে বিশদভাবে বর্ণনা করার বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়।

২১ কোটি টাকার প্রকল্পের পুরো টাকাই কেন বৈদেশিক পরামর্শক নিয়ে যাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘টিএ প্রকল্পগুলো সাধারণত এমনই হয়। সেজন্য ২১ কোটি টাকা তারাই পুরোটা খরচ করবে। এখানে আমাদের দেশি পরামর্শক থাকার সুযোগ নেই।’

বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প হলে কিছু আমাদের পরামর্শক থাকতো জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের টাকা নেই। এক টাকাও আমাদের নেই। স্প্যানিশ পরামর্শক ওদের জ্ঞান দিয়ে আমাদের একটি রিচ ডকুমেন্টস তৈরি করে দিয়ে যাবে।’