রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা আতিকুর রহমান। কয়েক মাস আগে রাতে বাসায় ফিরছিলেন। হাঁটাপথে মগবাজারে তাঁকে কুকুরে কামড় দেয়। পরদিন সকালে তিনি ছুটে যান মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। নেন জলাতঙ্কের টিকা।
আতিকুরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল গত শনিবার। জানালেন, তিনি এখন সুস্থ আছে। কোনো শারীরিক জটিলতার মুখে এখন পর্যন্ত তাঁকে পড়তে হয়নি।
জলাতঙ্কের শঙ্কা থেকে আতিকুর টিকা নিয়েছিলেন। জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। ফলে প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।
এ ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা—টিকা। আক্রান্ত প্রাণীর কামড়–আঁচড়ের পর দ্রুত সঠিক চিকিৎসা ও টিকা নিলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মৃত্যুর শত বছরের বেশি সময় পর আজও পাস্তুর স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর জলাতঙ্কের টিকার মাধ্যমে। প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় ‘বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস’ হিসেবে। এ বছর জলাতঙ্ক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘একসঙ্গে আরও শক্তিশালী’।
এবার ফেরা যাক দূর অতীতে। ১৮৮৫ সালে। ফ্রান্সে মানুষের অহরহ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছিল। তখন এই রোগের চিকিৎসা ছিল না। টিকাও আবিষ্কৃত হয়নি। সে বছরের জুলাইয়ে আলসাস অঞ্চলে জোসেফ মেইস্টার নামের নয় বছরের এক শিশুকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর কামড় দেয়। তা–ও একটি-দুটি নয়, ১৪টি কামড়। ছেলের অবস্থা দেখে প্রথমে ভেঙে পড়েছিলেন মা মারি অ্যাঞ্জেলিক। তবে পরে তিনি মনস্থির করেন, ছেলেকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত লড়বেন।
অ্যাঞ্জেলিক জানতে পারেন, প্যারিসে একজন জীবাণুবিদ জলাতঙ্কের টিকা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি ছেলেকে নিয়ে সেখানে ছুটে যান।

তবে সমস্যা বাধে অন্য জায়গায়। ওই জীবাণুবিদ জলাতঙ্কের টিকা নিয়ে কাজ করছিলেন ঠিকই, কিন্তু তখন পর্যন্ত কোনো মানুষের ওপর তা প্রয়োগ করা হয়নি। শেষমেশ প্রথম মানুষ হিসেবে মেইস্টারকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
১০ দিনে ১৩টি ইনজেকশন দেওয়া হয় মেইস্টারকে। শেষ পর্যন্ত শিশুটির জলাতঙ্ক হয়নি। সফল হয় মানুষের ওপর প্রথম প্রয়োগ করা জলাতঙ্কের টিকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, এখনো প্রতিবছর বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা এশিয়া ও আফ্রিকায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নয়টি দেশে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে।
তার পর থেকে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছেন। এতে বেঁচেছে অগণিত জীবন।
এই সফলতার পেছনে প্যারিসের সেই জীবাণুবিদের নাম লুই পাস্তুর। ১৮৯৫ সালে আজকের দিনে, অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর শত বছরের বেশি সময় পর আজও পাস্তুর স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর জলাতঙ্কের টিকার মাধ্যমে। প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় ‘বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস’ হিসেবে। এ বছর জলাতঙ্ক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘একসঙ্গে আরও শক্তিশালী’।
রসায়ন থেকে জীবাণুবিজ্ঞানে
পাস্তুরের জন্ম ১৮২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর, ফ্রান্সের দোলে শহরে। তিনি ছিলেন রসায়নবিদ। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে জীবাণু, সংক্রমণ আর রোগবালাই।
জীবাণু যে রোগবালাই সৃষ্টি করতে পারে—সে সম্পর্কে বিস্তর প্রমাণ দিয়েছিলেন পাস্তুর। রেশম পোকার সংক্রামক রোগ, মুরগির কলেরা, এমনকি অ্যানথ্রাক্স নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন।
পাস্তুরের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—কোনো জীবাণুর ক্ষমতা কমিয়ে সেটিকে শরীরে প্রবেশ করালে তা ভবিষ্যতে সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
গবেষণার এই শিক্ষাই পাস্তুরকে জলাতঙ্কের টিকা তৈরির দিকে নিয়ে যায়। জলাতঙ্ক নিয়ে গবেষণা তিনি অবশ্য একা করেননি। সহযোগী ছিলেন এমিল রু, শার্ল শঁব্রলাঁ, লুই থুইয়ের মতো বিজ্ঞানী। তাঁরা জলাতঙ্কে আক্রান্ত খরগোশের স্পাইনাল কর্ড বা মেরুরজ্জু নিয়ে পরীক্ষা করেন। এই মেরুরজ্জু বাতাসে শুকানো হতো। যত দিন যেত, রজ্জুতে থাকা জলাতঙ্কের জীবাণুর শক্তি তত কমে আসত।
বিজ্ঞানের কোনো দেশ নেই। জ্ঞান পুরো মানবজাতির সম্পদ। আর জ্ঞানই একটি মশালের মতো পৃথিবীকে আলোয় ভরিয়ে রাখে।লুই পাস্তুর, জীবাণুবিদ
এই দুর্বল জীবাণু প্রথমে কুকুরের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে কিছুটা কম দুর্বল জীবাণু প্রয়োগ করা হয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, কুকুরগুলোর শরীরে জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে, কুকুরের ওপর চালানো পরীক্ষা তো সফল হয়েছে, মানুষের ক্ষেত্রে হবে কি?
এই প্রশ্নের সুরাহা ঘটে মেইস্টারের ঘটনায়। তবে শিশুটিকে টিকা দিতে প্রথমে বড় ধরনের দ্বিধার মধ্যে ছিলেন পাস্তুর। কারণ, মানুষের জন্য এই টিকা নিরাপদ কি না, তা তখনো প্রমাণিত হয়নি।

এমন সময় এগিয়ে আসেন চিকিৎসক জ্যাক জোসেফ গ্রঁশে। গ্রঁশের সঙ্গে পাস্তুরের পরিচয় হয়েছিল মাত্র এক বছর আগে, ১৮৮৪ সালে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি পাস্তুরের পরামর্শদাতাদের একজন হয়ে ওঠেন। মেইস্টারকে টিকা দেওয়ার জন্য তিনি পাস্তুরকে উৎসাহ দেন। এমনকি গ্রঁশ পরে নিজ হাতে শিশুটিকে টিকার ইনজেকশনও দেন।
গল্পটা এখানেই থেমে থাকেনি। এর কয়েক মাস পর ঘটে আরেক ঘটনা। ১৫ বছর বয়সী রাখাল জ্যাঁ-বাতিস্ত জুপিলকে জলাতঙ্ক আক্রান্ত একটি কুকুর আক্রমণ করে। তাকেও পাস্তুরের চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাণে বাঁচে জুপিল।
এরপর পাস্তুরের চিকিৎসার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ জলাতঙ্কের চিকিৎসার জন্য প্যারিসে আসতে শুরু করে। রোগীর সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে জলাতঙ্কের আলাদা টিকাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাস্তুর ইনস্টিটিউট। এটি এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান।

বাজারে বা পাড়ার দোকানের একটি পণ্য সবারই কমবেশি চেনা—পাস্তুরিত দুধ। এই পাস্তুরিত শব্দটা কিন্তু লুই পাস্তুরের নাম থেকেই এসেছে। পাস্তুরের গবেষণা থেকেই এই পদ্ধতি বিকশিত হয়, যা পরে ‘পাস্তুরাইজেশন’ নামে পরিচিত হয়। পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর অণুজীবের সংখ্যা কমে যায়। ফলে দুধ নিরাপদ থাকে এবং তুলনামূলক বেশি সময় ভালো থাকে।
এই পদ্ধতি আবিষ্কারের ঘটনা জলাতঙ্কের টিকার বহু বছর আগের। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সে ওয়াইন ও বিয়ারশিল্প বড় একটি সমস্যার মুখে পড়েছিল। উৎপাদনের পর অনেক সময় এসব পানীয় দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত বা স্বাদ পরিবর্তন হয়ে যেত।
বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটতে গিয়ে পাস্তুর দেখতে পান, কিছু জীবাণু এসব পানীয় নষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী। তখনকার প্রচলিত ধারণার বিপরীতে তিনি প্রমাণ করেন, জীবাণু বাইরে থেকে এসে খাবার বা পানীয়র সঙ্গে মিশে বংশবিস্তার ঘটাতে পারে, নষ্ট করে দিতে পারে।
১৮৬০-এর দশকে পাস্তুর দেখান, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তরলকে কিছু সময় গরম করলে ক্ষতিকর অনেক অণুজীব ধ্বংস করা যায়। এরপর দ্রুত ঠান্ডা করলে পানীয়র গুণমান অনেকটা বজায় থাকে।
এই পদ্ধতিই পরে ‘পাস্তুরাইজেশন’ বা পাস্তুরীকরণ নামে পরিচিত হয়। আজকের দিনে সারা বিশ্বে দুধ, ফলের রসসহ বিভিন্ন পানীয় ব্যাপকভাবে পাস্তুরিত করা হয়।
জলাতঙ্ক: বাংলাদেশ পরিস্থিতি
পাস্তুরের জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কারের প্রায় দেড় শ বছর পেরিয়েছে। এই টিকা মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। তবে বিশ্বে জলাতঙ্ক এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, এখনো প্রতিবছর বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা এশিয়া ও আফ্রিকায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নয়টি দেশে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০১০ সালের আগে বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হতো জলাতঙ্কে।
২০১১ সালে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে কুকুরকে জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু করে সরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে সেই এলাকা কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব।

পাশাপাশি কুকুরের কামড়ের পর মানুষকে দ্রুত টিকা ও চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়। তার পর থেকে দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা দ্রুত কমে আসে।
২০১২ সালে এই রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় এক হাজার ৫০০ জন। ২০১৫ সালে আক্রান্ত হয় মাত্র ২০০ জনের মতো। একই সঙ্গে কমে জলাতঙ্কে মৃত্যুও।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘদিন কম থাকলেও সম্প্রতি তা আবার বাড়ছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ৪২ জন মানুষের। ২০২৪ সালে ৫৮ জনের। ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে মৃত্যু হয় ১৯ জনের।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ বিষয়টি এখনই উদ্বেগের কারণ নয়। তবে দ্রুত সময়ে কুকুর নিয়ন্ত্রণ এবং জলাতঙ্কপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন মানুষ ও কুকুরের মাঝে ব্যাপক হারে দিতে হবে।
এই যে বাংলাদেশসহ বিশ্বে জলাতঙ্কের প্রকোপ বহুগুণ কমেছে, অনেকেই টিকা নিয়ে ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পেরেছেন বা প্রাণে বেঁচেছেন, তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব পাস্তুরের। প্যারিসে বসে তাঁর আবিষ্কার করা জলাতঙ্কের টিকা আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের জীবন রক্ষা করছে।
অবশ্য পাস্তুর বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি বলতেন, এর কৃতিত্ব তাঁর নয়, বিজ্ঞানের।
ঠিক যেমন ১৮৭৬ সালে ইতালির মিলানে এক বক্তৃতায় পাস্তুর বলেছিলেন, বিজ্ঞানের কোনো দেশ নেই। জ্ঞান পুরো মানবজাতির সম্পদ। আর জ্ঞানই একটি মশালের মতো পৃথিবীকে আলোয় ভরিয়ে রাখে।
তথ্যসূত্র:
১. পাস্তুর ইনস্টিটিউট: দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ফার্স্ট র্যাবিস ভ্যাকসিনেশন ইন ১৮৮৫
২. ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ: লুই পাস্তুর—আ লিগ্যাসি আনমাস্কড
৩. ডব্লিউএইচও: দ্য র্যাবিস এলিমিনেশন প্রোগ্রাম অব বাংলাদেশ
৪. ডব্লিউএইচও: বাংলাদেশ ট্যাকলজ র্যাবিস থ্রু মাস ডগ ভ্যাকসিনেশন
৫. প্রথম আলো: জলাতঙ্কের রোগী বাড়ছে, কিন্তু কুকুরকে টিকাদান রয়েছে বন্ধ