কোনো মানুষ যদি এমন কোনো জায়গায় বসবাস করেন, যেখানে তার কাছে কোনো নবী-রাসুলের দাওয়াত পৌঁছেনি, পৌঁছেনি ইসলামের দাওয়াতও, এমনকি কোরআনের বাণী সম্পর্কেও তিনি জানার সুযোগ পাননি—তাহলে হাশরের ময়দানে তার পরকালীন ফয়সালা কীভাবে হবে? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তারা কি ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান না মানার কারণে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে, নাকি পরম করুণাময় আল্লাহ তাদের ভিন্ন কোনো মানদণ্ডে বিচার করবেন?
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক জুমার বয়ানে শরিয়তের অবস্থান জানিয়েছেন প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ। তার মতে, যাদের কাছে দ্বীনের আলো বা কোরআনের সুনির্দিষ্ট আহ্বান পৌঁছেনি, পরম বিচারক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরকালে তাদের প্রতি কোনো অন্যায্য বিচার করবেন না।
তিনি বলেন, ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো মানুষের কাছে দ্বীনের নির্দেশ না পৌঁছালে সেটির হিসাবও তার কাছে চাওয়া হবে না। হাশরের ময়দানে এ জাতীয় মানুষদের জিজ্ঞেস করা হবে না যে তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েছে কিনা কিংবা হালাল-হারামের সুনির্দিষ্ট বিধানগুলো মেনে চলেছে কিনা। কারণ যে হুকুম তাদের কাছে পৌঁছায়নি, সেটির দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে যেমনটি ঘোষণা করেছেন, পরম সৃষ্টিকর্তা কোনো মানুষের ওপর তার সাধ্যের বাইরের কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না।
তবে শরিয়তের আচার-অনুষ্ঠান থেকে ছাড় পেলেও তারা একবারে প্রশ্নাতীত থেকে যাবে না বলেও উল্লেখ করেন আহমাদুল্লাহ।
তিনি জানান, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই জন্মগতভাবে একটি ‘ফিতরাত’ বা সহজাত বিবেক-বুদ্ধি বিদ্যমান থাকে। এই সর্বজনীন ফিতরাতের ওপর ভিত্তি করেই হাশরের ময়দানে তাদের দুটি মৌলিক বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে—
- তাওহিদ বা সৃষ্টিকর্তার ওপর ঈমান: বিশাল সৃষ্টিজগত, আসমান-জমিন ও প্রকৃতির শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ করে তারা একজন একক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল কি না। এই ন্যূনতম বিশ্বাসের জন্য কোনো নবী-রাসুলের দাওয়াত পৌঁছানোর প্রয়োজন পড়ে না; সৃষ্টিজগত পর্যবেক্ষণই আল্লাহর অস্তিত্ব অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট।
- মানবিক ন্যায়বিচার ও ফিতরাতি নৈতিকতা: তারা অন্য মানুষের প্রতি কোনো জুলুম বা অবিচার করেছে কি না। কারো ওপর অত্যাচার না করা এবং ইনসাফ বজায় রাখা একটি প্রাকৃতিক বা ফিতরাতি গুণ, যা প্রত্যেক সুস্থ বিবেকের মানুষের বোধগম্য।
আহমাদুল্লাহ আরও বলেন, বর্তমান এআই প্রযুক্তি ও সিসি ক্যামেরার যুগে মানুষের গতিবিধি, পদক্ষেপ ও সূক্ষ্ম কর্মকাণ্ড যেভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে, তা দেখে মানুষ বিস্মিত হয়। আর এই প্রযুক্তিবিদ ও মানুষের পরম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কেয়ামতের ময়দানে যে কতটা সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে ইনসাফের মানদণ্ড স্থাপন করবেন, তা মানুষের সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনা ও কল্পনারও বাইরে। মানুষের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর অসীম ইনসাফকে পরিমাপ করতে যাওয়া নিরর্থক।
অতএব, ইসলামের দাওয়াত না পাওয়া মানুষদের বিচার হবে তাদের প্রাপ্ত সুযোগ, প্রাকৃতিক বিবেক এবং তাওহিদের প্রতি সহজাত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। পরম বিচারক আল্লাহ তাআলা কারো ওপর বিন্দুমাত্র জুলুম করবেন না, বরং তাঁর পরম ন্যায়বিচার দিয়েই হাশরের ময়দানে বান্দার হিসাব নিষ্পন্ন করবেন।