Image description

প্রতিবেদন তৈরির জন্য কোনো দপ্তরের নির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলেন একজন সাংবাদিক। আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য পাওয়ার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সময় পার হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় তথ্য পান না সাংবাদিকরা। আবার আবেদনটির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তও জানানো হয় না।

জাগো নিউজের জেলা পর্যায়ের একাধিক প্রতিবেদক জানান, বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর নির্ধারিত সময়ে তথ্য পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবেদন গ্রহণের পর আর কোনো যোগাযোগ থাকে না। ফলে আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, নাকি সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়নি। সেটিও পরিষ্কার হয় না।

তথ্য পাওয়ার অভিজ্ঞতার আরেকটি দিকও আছে। উত্তরাঞ্চলের একটি জেলার এক দপ্তরে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরে তারা প্রায় ১৮ হাজার পৃষ্ঠার দাপ্তরিক নথি বস্তায় ভরে জাগো নিউজের প্রতিবেদককে দিয়েছে। বিপুল সেই কাগজের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করার দায়িত্ব পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক।

জাগো নিউজের কান্ট্রি ডেস্কের ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন বলেন, তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরে সরকারি কর্মকর্তারা বস্তায় ভরে সব কাগজ পাঠিয়েছেন। প্রয়োজনীয় তথ্য আলাদা করে চিহ্নিত না করে বিপুল নথি পাঠানো হলে আবেদনকারী তথ্য খুঁজতে গিয়ে আরেক ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।

অথচ তথ্য অধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্য এর বিপরীত। তথ্যকে নাগরিকের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। আইন প্রণয়নের ১৭ বছর পর আজ আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসে তাই প্রশ্ন সামনে আসে, কাগজে-কলমে নাগরিকের যে অধিকার এত স্পষ্ট, বাস্তবে সেই অধিকার কতটা সহজে প্রয়োগ করা যাচ্ছে?

 

আইনে নাগরিকের তথ্য অধিকার কী

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। তথ্য বলতে শুধু কোনো নির্দিষ্ট কাগজ বা প্রতিবেদন নয়। স্মারক, বই, নকশা, মানচিত্র, চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, আদেশ, বিজ্ঞপ্তি, দলিল, প্রতিবেদন, হিসাব বিবরণী, প্রকল্প প্রস্তাব, ছবি, অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন ধরনের উপকরণ এর আওতায় পড়ে।

তবে সব তথ্য প্রকাশযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন তথ্যসহ আইনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। আবার কোনো নথির একটি অংশ প্রকাশযোগ্য না হলেও বাকি অংশ আলাদা করা সম্ভব হলে প্রকাশযোগ্য অংশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তথ্য পাওয়ার জন্য নাগরিককে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বা ই-মেইলে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তথ্য পাওয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেই আবেদন করার কথা।

 

তথ্য কমিশনের লোগো
 
তথ্য কমিশনের লোগো

২০ কার্যদিবসের হিসাব

তথ্য অধিকার আইনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট সময়সীমা। সাধারণ ক্ষেত্রে আবেদন পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার কথা। একাধিক তথ্য প্রদান ইউনিট বা কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততা থাকলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে।

কোনো কারণে তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে আবেদন পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ জানিয়ে আবেদনকারীকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। আর জীবন-মৃত্যু, গ্রেফতার বা কারাগার থেকে মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তথ্য দেওয়ার কথা।

নির্ধারিত সময়ে তথ্য না দিলে আইন অনুযায়ী আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে গণ্য হয়। তখনও আবেদনকারীর জন্য প্রতিকারের পথ খোলা থাকে।

তথ্য না পাওয়া বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা যায়। আপিল কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার কথা। এরপরও সন্তুষ্ট না হলে কিংবা নির্ধারিত সময়ে আপিলের সিদ্ধান্ত না পেলে, তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ আইনটি শুধু তথ্য চাওয়ার অধিকার দেয়নি। তথ্য না পাওয়ার ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে একটি প্রতিকারব্যবস্থা রেখেছে।

তবে এখন সমস্যা তৈরি হচ্ছে সেই প্রতিকারব্যবস্থার শেষ গুরুত্বপূর্ণ স্তরটিতে।

কমিশনারহীন তথ্য কমিশন

তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী প্রধান তথ্য কমিশনার ও অন্য দুজন তথ্য কমিশনারের সমন্বয়ে তথ্য কমিশন গঠিত হবে, যাদের মধ্যে অন্যূন একজন নারী হবেন। প্রধান তথ্য কমিশনার তথ্য কমিশনের প্রধান নির্বাহী হবেন। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেক ও তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। আরেক তথ্য কমিশনার মাসুদা ভাট্টিকে গত বছরের ১৬ জানুয়ারি অপসারণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার নতুন কমিশন গঠন করেনি।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাস পর কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নেতৃত্বাধীন নতুন বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান ও মাসুদ সাঈদী এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ। কমিটি প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারের প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেই তথ্য কমিশনের সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরবর্তীসময়ে প্রশাসনিকভাবে কমিশনের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হলেও শীর্ষ তিন কমিশনারের পদে নিয়োগ না হওয়ায় অভিযোগের শুনানি ও নিষ্পত্তির মতো মূল কাজ আটকে থাকে।

তথ্য কমিশনের গবেষণা কর্মকর্তা রাবেয়া হেনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিশনারদের অনুপস্থিতির সময়েও কমিশনে অভিযোগ আসছে। বর্তমানে প্রায় ৮৫০টি অভিযোগ অপেক্ষমাণ।

রাবেয়া হেনা জাগো নিউজকে বলেন, অভিযোগগুলো গ্রহণ ও নথিভুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু কমিশন বর্তমানে গঠিত না থাকায় এসব অভিযোগের শুনানি হচ্ছে না। কমিশন গঠিত হলে সেগুলো উপস্থাপন করা হবে।

অর্থাৎ তথ্য চেয়ে আবেদন, আপিল। সব ধাপ পেরিয়ে যে জায়গায় নাগরিকের শেষ প্রতিকার পাওয়ার কথা, সেই জায়গায় বর্তমানে শুনানি আটকে আছে।

তথ্য কমিশনের সচিব (রুটিন দায়িত্ব/অতিরিক্ত) মো. শাহ আলম জাগো নিউজকে বলেন, কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তার আশা, অক্টোবরের মধ্যে নতুন কমিশন গঠিত হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।

তথ্য কমিশনের কাজ শুধু অভিযোগের শুনানিতে সীমাবদ্ধ নয়। আইনে কমিশনকে তথ্য প্রদান, তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বিশেষ তথ্য প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তথ্যের আবেদন বা আপিল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে, নির্ধারিত সময়ে তথ্য না দিলে, অসদুদ্দেশ্যে আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে কিংবা তথ্য পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে কমিশন প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে। প্রয়োজনে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করতে পারে।

কমিশন গঠনে দলীয় প্রভাবমুক্তির দাবি

তথ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের একটি দাবি হলো—তথ্য কমিশনকে কার্যকর, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।

চলতি বছরের ৬ আগস্ট তথ্য অধিকার ফোরাম প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই তথ্য কমিশনার নিয়োগে দক্ষতা, যোগ্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তভাবে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়, কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নিরপেক্ষতা ও তথ্য অধিকার বিষয়ে কাজের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাদের মতে, স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন ছাড়া আইনে থাকা অধিকার বাস্তবে পূর্ণ অর্থ পায় না।

কমিশনের তিন পদে নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিও যোগ্য ও আগ্রহী প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেছে।

 

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত তথ্য কমিশন, ছবি: সংগৃহীত
 
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত তথ্য কমিশন, ছবি: সংগৃহীত

 

তথ্য চাওয়ার আগেই তথ্য প্রকাশের কথা

তথ্য অধিকার আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ। অর্থাৎ নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে। আইনের কাঠামো এমন নয়।

আইনের ৬ ধারায় কর্তৃপক্ষকে তাদের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য করে প্রকাশ ও প্রচারের কথা বলা হয়েছে। একই ধারায় প্রতিবছর প্রতিবেদন প্রকাশের কথাও রয়েছে।

সেসব প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, প্রযোজ্য আইন-বিধি-বিধান এবং নাগরিকের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য থাকার কথা।

গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা প্রকাশ এবং প্রয়োজনে তার কারণ ব্যাখ্যা করার বিধানও রয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বা অন্য উপায়ে প্রচারের কথাও বলা হয়েছে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন ও স্বপ্রণোদিত তথ্য নিয়মিত এবং সহজে পাওয়া যায় না। ফলে যে তথ্য কর্তৃপক্ষের নিজেদের উদ্যোগেই প্রকাশ করার কথা, সেটিও অনেক সময় সাংবাদিক বা নাগরিককে আলাদাভাবে খুঁজতে হয়।

এখানেই তথ্য অধিকার আইনের দুটি দিক সামনে আসে। একটি নাগরিকের আবেদনের ভিত্তিতে তথ্য সরবরাহ, অন্যটি কর্তৃপক্ষের স্বপ্রণোদিত প্রকাশ। দ্বিতীয়টি কার্যকর হলে প্রথমটির ওপর চাপও কমতে পারে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্যের গুরুত্ব

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাইসুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, তথ্য অধিকার আইন শুধু প্রশাসনিক আইন নয়। রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি আদায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আইন প্রণয়নের পরও এর বাস্তব প্রয়োগে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং তথ্য গোপনের পুরোনো সংস্কৃতি বাধা হিসেবে কাজ করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশও যথেষ্ট নয়।

রাইসুল ইসলাম বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য দালিলিক তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য নথি ছাড়া অনুসন্ধান অনেক সময় অভিযোগনির্ভর হয়ে পড়তে পারে। আবার তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, তথ্য কমিশনকে আরও কার্যকর করা, অযৌক্তিক বিলম্ব বা তথ্য প্রদানে অনীহার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্যকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও নাগরিকদেরও আইনটি ব্যবহারে আরও দক্ষ হতে হবে।

‘আইন আছে, কিন্তু কমিশন নেই’

তথ্য অধিকার ফোরামের কোর গ্রুপের সদস্য এবং মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির মূল সংকটটি হলো তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান তথ্য ক‌মিশন অকার্যকর থাকা।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তারা নির্ধা‌রিত কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য প্রদান করবেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আপিল কর্তৃপক্ষ তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। অর্থাৎ কমিশন কার্যকর না থাকলেও আইন অনুসারে আবেদন ও আপিল পর্যায়ে তথ্য প্রদানের কাঠামো বন্ধ হয়ে যায়নি।

তবে কোনো দা‌য়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আপিল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য না পেলে অভিযোগ প্রদানের শেষ আশ্রয় তথ্য কমিশন। কমিশন কার্যকর না থাকায় সেই অভিযোগগুলোর শুনানি ও নিষ্পত্তি স্থ‌গিত আছে।

হাসিবুর রহমানের মতে, বিগত দুই বছর ধরে দেশে তথ্য কমিশন অকার্যকর রয়েছে। কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়‌নি।

হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আইন আছে, কিন্তু কমিশন নেই’—এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ তথ্য পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হলে শেষ পর্যন্ত অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর কমিশন প্রয়োজন।

তথ্য প্রা‌প্তির সময়সীমা নিয়ে তিনি বলেন, আইনে সাধারণভাবে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার কথা। তথ্য না পেলে আবেদনকারীকে আপিল করতে হয়, এরপরও তথ্য না পেলে কমিশনে অভিযোগ করতে হয় এবং এটি এক‌টি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

তার মতে, তথ্য অধিকার আইনকে আরও কার্যকর করতে সময়সীমাসহ কিছু বিধান পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের বিষয়েও গুরুত্ব দেন হাসিবুর রহমান। তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৬ এবং তথ্য প্রকাশ ও প্রচার-সংক্রান্ত প্রবিধানমালা ২০১০-এ কর্তৃপক্ষের স্বপ্রণো‌দিত তথ্য প্রকাশ বিষয়ে বিস্তা‌রিতভাবে বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে এটির অনুসরণ কতটুকু হচ্ছে, তার মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

‘নাগরিকের অংশগ্রহণের জন্য তথ্য দরকার’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান নির্বাহী এবং ট্রাস্টি ড. বদিউল আলম মজুমদারের কাছে তথ্য অধিকার শুধু তথ্য পাওয়ার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকের অংশগ্রহণের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, নাগরিককে রাষ্ট্রের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে হলে তথ্য প্রয়োজন। কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ এবং সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মতামত দেওয়ার জন্যও তথ্যের প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই তথ্য অধিকার আইনের গুরুত্ব।

তার মতে, নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের উদ্যোগের ফলেই তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল নাগরিককে ক্ষমতায়িত করা এবং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইন অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা থাকার কথা। নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে এমন নয়; আইন কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশের ব্যবস্থাও দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্যের চরিত্র নিয়েও আইনি ব্যাখ্যা রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি মামলায় আদালতও কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্যকে জনগণের তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তবে আইনে নির্ধারিত ব্যতিক্রমের আওতাভুক্ত তথ্য এর বাইরে থাকবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, তথ্য কমিশন গঠন এখন জরুরি। কমিশন না থাকায় আগে করা বহু আপিল ও অভিযোগের সুরাহা আটকে রয়েছে। নতুন কমিশনে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, যারা সক্ষম, নিরপেক্ষ এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

তিনি তথ্য অধিকার আইনকে আরও কার্যকর করতে আইনটির কিছু বিষয় সংশোধন ও পরিমার্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

আইন আছে, কাঠামোও আছে: প্রশ্ন প্রয়োগে

তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের কাঠামো শুধু ২০০৯ সালের মূল আইনে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর পাশাপাশি তথ্য প্রাপ্তি-সংক্রান্ত বিধিমালা, তথ্য প্রকাশ ও প্রচার প্রবিধানমালা, তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্রবিধানমালা এবং অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত প্রবিধানমালা রয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আবেদনকারীদের নির্দেশিকা এবং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ নির্দেশিকাও রয়েছে।

আইনে তথ্য চাওয়া, তথ্য প্রকাশ, সংরক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকে তথ্যের ক্যাটালগ ও ইনডেক্স তৈরি করে যথাযথভাবে সংরক্ষণের কথাও বলা হয়েছে। সম্ভব হলে তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও নাগরিকের সহজপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করার বিধানও রয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাইসুল ইসলাম বলেন, তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করতে শুধু আইন ও বিধিমালা থাকলেই হবে না, এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্যকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি এবং অযৌক্তিক বিলম্ব বা তথ্য প্রদানে অনীহার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ জরুরি।

এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমানও মনে করেন, আইনের প্রতিকারব্যবস্থাকে কার্যকর করা জরুরি। তার মতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আপিল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য না পাওয়া গেলে নাগরিকের শেষ আশ্রয় তথ্য কমিশন। তাই কমিশন কার্যকর না থাকলে তথ্য অধিকার আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর অকার্যকর হয়ে পড়ে।

ফলে তথ্য অধিকার আইনে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি পাওয়া গেলেই তথ্য পাওয়ার অধিকার বাস্তবায়িত হয়েছে; এমনটা বলা যায় না। প্রয়োজনীয় তথ্য কতটা সহজে শনাক্ত, বোঝা ও ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।