Image description

দেশে একসময়ের সবচেয়ে সস্তার ঋণদাতা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সুদের হার বাড়তে বাড়তে পৌঁছেছে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশে। ঠিকাদার নিয়োগসহ সব পর্যায়েই সংস্থাটির একক আধিপত্য। বাংলাদেশ সরকার না পারছে চলমান প্রকল্প মাঝপথে বন্ধ করতে, না পারছে ঋণ চালিয়ে যেতে। এরই মধ্যে কয়েকদিন আগেই জাইকার ঋণে অনুমোদন দেওয়া হলো দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবের। যদিও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের অনেকেই উদ্বেগ জানিয়ে বিরোধিতা করেন এই ঋণের।

তাদের পরামর্শ ছিল, জাইকার ঋণ বাদ দিয়ে বিকল্প কিছু ভাবা অথবা প্রকল্প দুটি আপাতত স্থগিতের। তবে জাপানের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েনের আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মেলে অনুমোদন।

অবশ্য ভবিষ্যতে জাইকা থেকে যেকোনো ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা ও বিশদ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি হওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘জাইকা আগে সস্তা ঋণ দিলেও এখন তাদের সুদহার যেমন বাড়ছে, তেমনি শর্তও কঠিন হচ্ছে। এক্ষেত্রে সংস্থাটি বছরে দুবার ঋণ পর্যালোচনা করে থাকে। আমরা যেখানে কম সুদে এবং সহজশর্তে ঋণ পাব, সেখান থেকেই নেব। এটিই স্বাভাবিক। এখানে একটি সংস্থার কাছ থেকেই যে ঋণ নিতে হবে, বিষয়টি তো এমন নয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুরুর দিকে জাইকার দেওয়া ঋণে সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৫ সাল থেকে বহাল ছিল এই হারই। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। বিভিন্ন সময় বাড়তে থাকে সুদহার। গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সর্বশেষ দফার বর্ধিত সুদহার কার্যকর হয় ১৫ এপ্রিল থেকে। ফলে বর্তমানে সুদহার দাাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশে। এ ছাড়া পরামর্শক সেবা খাতে ঋণের সুদের হার শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ শতাংশ। যুক্ত করা হয়েছে অন্য আরও শর্তও। তবে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ও রেয়াতকাল আছে আগের মতোই।

এ প্রসঙ্গে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর ভাষ্য, ‘আমরা শুরু থেকেই এই সুদ বাড়ানোর বিপক্ষে ছিলাম। বারবার জাইকার কাছে চিঠি দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।’

একনেকের সবশেষ বৈঠক হয় গত ১৬ সেপ্টেম্বর। এর কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বৈঠকে মেট্রোরেল নির্মাণের একটি নতুন এবং দুটি সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ বৈঠকে জাইকার ঋণ নিয়ে সমালোচনা হয়।

এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ লাখ  ১৪ হাজার ৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬২ লাখ এবং সরকারি তহবিলের ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। এটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এখন প্রথম সংশোধনীতে বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এ নিয়ে অনেক দেনদরবারের পর প্রথম প্রস্তাবের তুলনায় কিছুটা কমালেও জাইকা বলেছে, এর চেয়ে কম টাকায় এটি করতে পারবে না তারা।

এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৪  লাখ এবং সরকারি তহবিলের ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা। কিন্তু এটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে এসে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এটির ক্ষেত্রেও অনেক চাপাচাপি করা হয়েছিল। কিন্তু জাইকা সাফ জানিয়ে দেয়, এর চেয়ে কমে করা যাবে না।

একনেক বৈঠকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দিতে গিয়ে আপত্তি দেন অনেকেই। কেননা সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি।

সভায় অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বললেন, ‘জাইকার ঋণগ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে। তাই বিকল্প ঋণের উৎস অনুসন্ধান করতে হবে। এ ছাড়া জাপানের ঋণের শর্ত এমন থাকে যে, টেন্ডারে অন্য কোনো দেশ অংশ নিতে পারে না। নেগোসিয়েশনের (দরকষাকষি) সময় সুদের হার লক করা প্রয়োজন। তাহলে সুদহার বাড়লেও আগের সুদহারই বহাল থাকবে। যেমন এ প্রকল্পে (এমআরটি লাইন-৫, নর্দান রুট) ২০১৯ সালের চুক্তি অনুযায়ী সুদের হার ১ শতাংশের নিচে থাকার কথা। কিন্তু লক না করায় এখন বাড়তি সুদ গুনতে হচ্ছে।’

জাইকার সুদহার বাড়া নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরলেন শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও। তিনি বললেন, ‘ঋণ নেওয়া হয়েছিল জাপানিজ ইয়েনে, যার মূল্য বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্প ব্যয় এত বেড়েছে যে, বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অর্থায়নের জন্য জাপান ছাড়া অন্য কোনো ভালো অপশন (বিকল্প) রয়েছে কি না, তাও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।’

বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বললেন, ‘এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, জাপান থেকে ঋণ গ্রহণ করা হলে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা খুব কম। তাই নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন যে, জাপান থেকে ঋণ গ্রহণ করা হবে না, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করা হবে।’

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কণ্ঠেও ছিল অনেকটা একই সুর। তিনি একনেক বৈঠকে বললেন, ‘এই ব্যয় বৃদ্ধি বর্তমান অর্থবছরের এডিপিকে চাপে ফেলবে। জাপান আমাদের ভালো বন্ধু, তাই তাদের উচ্চপর্যায়ে নেগোসিয়েশন করা দরকার। ততদিন পর্যন্ত আপাতত প্রকল্পটির সংশোধন প্রস্তাবটি স্থগিত রাখা যায়।’ এ সময় বিকল্প মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়নেরও প্রস্তাব দেন অর্থ উপদেষ্টা।

তবে জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বিবেচনায় রেখে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মত দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বললেন, ‘চলমান প্রকল্প হওয়ায় এটি স্থগিত রাখা ঠিক হবে না। প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলে জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতে ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’

একই ধরনের মত দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার ভাষ্য ছিল, ‘সুদের হার এবং শর্ত নিয়ে এর মধ্যে জাইকার সঙ্গে উচ্চতর পর্যায়ে নেগোসিয়েশন সম্পন্ন হয়েছে। জাপানের সঙ্গে আমাদের ঋণচুক্তির বাইরেও অনেক দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ঋণের সুদের হার বেশি হলেও গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর এবং রি-পেমেন্ট মেয়াদ ৪০ বছর, যা অনেক নমনীয়। এ ছাড়া জাপানের কাজের গুণগত মান অনেক ভালো। এসব দিক বিবেচনায় ঋণচুক্তি বাতিল করা সমীচীন হবে না।’

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গভর্নর বললেন, ‘সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্প ব্যয় সবচেয়ে বেড়েছে মেইন লাইন, সিভিল ও স্টেশন নির্মাণ কার্যক্রমে। এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কী?’

এর জবাবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বললেন, ‘কাজের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বিনিময় হার এবং সংশ্লিষ্ট ভ্যাট ও আয়কর বাড়ার কারণেও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তবে কাজ শুরুর সময় বিস্তারিত নকশা তৈরি করা হলে অনেক নতুন অঙ্গ সংযুক্ত করার প্রয়োজন হয়।’

এ সময় অর্থ বিভাগের সচিব বললেন, ‘জাপানি ঋণের ক্ষেত্রে শর্ত এরূপ থাকে যে, টেন্ডারের সময় অন্য কোনো দেশ অংশগ্রহণ করতে পারে না। যে কারণেও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পায়।’

বৈঠকে জাইকার ঋণগ্রহণের যৌক্তিকতা ফের বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বললেন, ‘জাপান থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদে একবার আলোচনা হয়েছিল। তখন সুদের হার ধরা হয়েছিল শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ এবং এর চেয়ে নিম্ন সুদের হারে আর কোনো ঋণ পাওয়া যাবে না বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সুদের হার ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। তাই এই ঋণগ্রহণের যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বৈঠকে জানালেন, ঋণচুক্তির সুদের হার চূড়ান্ত করা হয়নি। যদি ফিক্সড রেটে ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে সুদের হার হবে আনুমানিক ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। গ্রান্ট এলিমেন্ট হবে ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সুদহার বেশি পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে ফ্ল্যাক্সিবল রেটে নিলে সুদের হার ১ দশমিক ১৫ থেকে ১ দশমিক ৬ শতাংশ আর গ্রান্ট এলিমেন্ট হবে ৪১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। সুদের হারও কিছুটা কম পরিশোধ করতে হবে। তাই কোন হারে ঋণ নেওয়া হবে, সে বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এমন প্রেক্ষাপটে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বললেন, ‘জাইকার সঙ্গে নেগোসিয়েশনের আর কোনো সুযোগ নেই। এখন যত বিলম্বিত হবে, সুদহার তত বাড়তে থাকবে। কিছু কিছু টেন্ডারের ক্ষেত্রে এর মধ্যে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। এখন ঋণ বাতিল করা হলে তারা মামলায় যাবে এবং আমাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাই এ মুহূর্তে অন্য কোনো বিকল্প নেই। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে।’

মন্ত্রী ও আমলাদের মতামত শেষে সিদ্ধান্ত জানালেন বৈঠকের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বললেন, ‘সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কাজের পরিধিও অনেক বেড়েছে। অন্য কোনো মডেল বা অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থায়নের সম্ভাবনা অনিশ্চিত এবং জাপান সরকারের সঙ্গে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয়, রাজনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হলো।’

এমআরটি লাইন-১-এর ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের মন্তব্য আসে। বিশেষ করে আপাতত স্থগিত রাখার পক্ষে মত দেন কেউ কেউ। পরে সেটিও বাধ্য হয়েই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।