সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার একটি বীরগাঁও ইমামদুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজ মিয়ার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ একাধিক অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বিরুদ্ধে। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে বিষয়টি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হলেও অদৃশ্য কারণে তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। তবে সেই কমিটি প্রধান শিক্ষক আজিজ মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হতে পারে বলে অভিযোগকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বীরগাঁও ইমামদুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজ মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র অভিযোগ দিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে মাউশির দুইজন কর্মকর্তা তদন্তে এসেছিলেন। তারা কী করেছে না করে করেছে সেটি জানা আপনার কাজ না। আপনি যা পারেন করেন।’
উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদন ঘেটে দেখা গেছে, ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে পারফরমেন্স বেজড গ্র্যান্টস ফর সেকেন্ডারি ইন্সটিটিউশনস (PBGSI) স্কিমের ৫ লাখ টাকার মধ্যে বইপত্র-লাইব্রেরী, শিক্ষা উপকরণ এবং গবেষণা সরঞ্জাম ইত্যাদির উন্নয়ন বাবদ ১ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয়িত ৫৫ হাজার ৮১৫ টাকা এবং অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, কমনরুম ইত্যাদি উন্নয়ন বাবদ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার মধ্যে ব্যয়িত ৭৮ হাজার ৬৫ টাকার দাখিলকৃত খরচের বিল-ভাউচার সঠিক ছিল না। অর্থাৎ প্রধান শিক্ষক আজিজ মিয়া ভুয়া ভাউচার তৈরি করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যয় বাবদ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণের ভাউচার এর মধ্যে একজন শিক্ষার্থীর বিতরণকৃত তালিকার স্বাক্ষরের মিল পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর জাল করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। বরাদ্দকৃত মোট ৫ লাখ টাকার মধ্যে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৫ টাকা বিধিবহির্ভূত ভাবে প্রধান শিক্ষক নিজের কাছে রেখেছেন।
বিদ্যালয়ের ব্যাংক স্টেইটমেন্ট এর তথ্য অনুযায়ী উক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। আদায়কৃত রশিদ ও আদায় রেজিস্টারের আয়ের সাথে ব্যাংক স্টেইটমেন্ট এর গড়মিল রয়েছে। আদায় রেজিস্টারের সাথে আংশিক ক্যাশ কলামের মিল পাওয়া যায়। আদায় রেজিস্টারটি ২০১৭ সালের জানুয়ারি হতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আপডেট করা হলেও পরবর্তীতে আদায় রেজিস্টারটি আপডেট করা হয়নি। রশিদ বহির মুড়ির অংশে আদায়কারীর কোন স্বাক্ষর নেই। টাকা উত্তোলনকারী এবং গ্রহণকারীর কোন স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।
ব্যাংক হিসাবেও অসঙ্গতির
তদন্ত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত না হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফি আদায়ের ক্ষেত্রে যথাযথ রসিদ না দেওয়া এবং আদায় করা অর্থের হিসাব সংরক্ষণে অসঙ্গতির অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।
অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কোনো কোনো অর্থ আদায়ের বিপরীতে যথাযথ নোটিশ, আদায় রসিদ বা ব্যয়ের প্রমাণপত্র দেখাতে না পারার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসএসসি শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের অনুযায়ী, তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পাওয়ার পর তৎকালীন ইউএনও অভিযোগগুলোর সত্যতা পাও ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়।
উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে সচিবালয়
অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তৎকালীন ইউএনও অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন পাঠান। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান।
অভিযোগকারীর দাবি, বিষয়টি নিয়ে সচিবালয়ে যোগাযোগ করা হলে তাদের জানানো হয়, নথিটি আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) পাঠানো হয়েছে । কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অভিযোগকারী ওই বিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে ইউএনওকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ইউএনও সবকিছু পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছেন। জেলা প্রশাসনও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে। পরে জানতে পারলাম মাউশিতে পাঠানো হয়েছে। তাহলে এতদিনেও ব্যবস্থা হচ্ছে না কেন?’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্তে অনিয়মের তথ্য উঠে এলে কর্তৃপক্ষের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি নথিতে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের বিভিন্ন অংশের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ থাকার পরও ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নিয়ে জানতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তকে অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।’