Image description

ধর্ষণচেষ্টাসহ জুনিয়র শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি, ‘ডিজিএফআই দিয়ে’ তুলে নেওয়া ও ‍গুম-খুনের হুমকি প্রদানসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সানবিম হক নিরবের বিরুদ্ধে। মেডিকেলের অধ্যক্ষের কাছে এসব ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে বয়কট এবং ছাত্রদল থেকে বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন নিরব। একই সাথে অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে কলেজ প্রশাসন।

সানবিম হক নিরব মেডিকেলের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, বর্তমানে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। গত ১ মে ছাত্রদল সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গঠিত সিরাজগঞ্জ মেডিকেলের ৮ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে ঠাঁই পান নিরব। গত ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার আলীর কাছে তার বিরুদ্ধে অন্তত ১১টি আলাদা অভিযোগপত্র দায়ের করেন শিক্ষার্থীরা।

অভিযোগপত্রগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, এসব অভিযোগপত্রে যৌন হেনস্তা ও ধর্ষণচেষ্টা এবং এর প্রতিবাদ করলে হুমকি, মেসে টাকা না দিয়েও নিয়মিত খাওয়া, নারী শিক্ষার্থীদের বডি শেমিং, গালাগালি এবং প্রফ পরীক্ষায় অকৃতকার্য, ‘ডিজিএফআই দিয়ে’ গুম ও হত্যার হুমকি প্রদান, ছাত্রলীগ ও শিবির ট্যাগ দিয়ে নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ প্রশাসন। এতে প্রধান করা হয়েছে সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এসএম কামরুল হাসান মুরাদকে। কমিটিকে প্রথমে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও কমিটির আবেদনের প্রেক্ষিতে সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়েছে।

ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হেনস্তা ও বডি শেমিং
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সানবিম হক নিরব এই মেডিকেলের জুনিয়র ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর সাথে যৌন হেনস্থা, জোরপূর্বক ধর্ষণ প্রচেষ্টা এবং এর প্রতিবাদ করলে তাকে নানা প্রকার হুমকির সম্মুখীন করার মতো জঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে। উপরন্তু, ১২তম ব্যাচের অনেক মেয়ে শিক্ষার্থীদের অনুরূপ অবস্থা ও প্রস্তাবের সম্মুখীন করছে। জুনিয়র আরও এক ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথেও অনুরূপ কার্যকলাপের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়াও অনেক আভযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এ অবস্থায়, আমরা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ একাডেমিক ব্যবস্থা গ্রহণের করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া একই ব্যাচের অপর এক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘ক্যাম্পাসে বয়েজ হোস্টেলের সামনে অবস্থিত রাজু মামার দোকানে নারী সহপাঠীকে সম্পর্কে অশালীন বাক্য ও সেক্সুয়ালি বডি শেমিং করে সানবিম হক নিরব।’

একই দিন অপর এক শিক্ষার্থীর দেওয়া অভিযোগপত্রেও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিরব তার সহধর্মিনীকে নিয়ে অত্যন্ত কুরূচিপূর্ণ মন্তব্য করেন।

‘প্রফ, প্রিন্সিপাল স্যার সব তার হাতে’
শিক্ষার্থীদের দেওয়া অভিযোগপত্রের বড় একটি অংশে সানবিম হক নিরবের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার এবং শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি-ধমকি প্রদানের কথা বলা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া অভিযোগপত্রে এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, ‘নিরব নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে বিভিন্ন হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি গালিগালাজ করত। যেকোনো সময় হল থেকে বাইরে ডেকে নিয়ে যেত। ফলে পড়াশোনায় সমস্যা হতো। আইটেম এবং কার্ডের কথা বললে বলত যে, তোদের প্রফ পাশ, তুই আর কী চাস? এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আমাকে ও আমাদের ব্যাচ ব্যাচমেটদের হল থেকে বের করতে চাইত।’

অপর এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ‘ক্যাম্পাসে আসার প্রথম দিক থেকে আমি ১০ম ব্যাচের সানবিম হক নিরব কর্তৃক বিভিন্ন হুমকির সম্মুখীন হই। বড় ভাই হিসেবে যথেষ্ট সম্মান করার পরেও তার স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে আইনি হুমকি, পুলিশ দিয়ে ভয় দেখানোর কথা এবং পরীক্ষায় পাশ করতে না পারার হুমকি দিয়েছে। এতে আমার স্বাভাবিক পড়াশোনার ক্ষতি এবং আমি মানসিকভাবে বিপর্যয়স্ত হয়ে পড়েছি।’

মেডিকেল কলেজটির ১২তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী গত ১৮ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষের কাছে দেওয়া আবেদনের বলেছেন, তিনি সানবিম হক নিরব কর্তৃক হেনস্তার শিকার। অভিযোগে তিনি লেখেন, ‘২৩ জুলাই বলেছিল আজ যেন তোর ব্যাচের সব মাঠে আসে। না হলে কিন্তু অবস্থা খারাপ হবে। ৫টার মধ্যে যেন সবাই যায়। নিজের অনেক লোকজন আছে দেখাতে ক্যাম্পাসে জোরপূর্বক আমাদের ৫-৭ জনকে সাথে নিয়ে ঘুরত। মাঝে মধ্যে বলতো প্রফ, পিন্সিপাল স্যার, সব তার হাতে। পুরো ব্যাচের সকল ছাত্রকে ক্রিকেট খেলতে নামিয়েছিল থ্রেট দিয়ে।’

এ ছাড়াও সানবিম হক নিরবের বিরুদ্ধে মাসের পর মাস টাকা না দিয়ে মিল গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে কথা বলায় এক শিক্ষার্থীকে মৌখিকভাবে এবং অনলাইনে হুমকি দিয়েছেন নিরব। এ বিষয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া অভিযোগে নিরবের সহপাঠী লিখেছেন, আমি এই মাসের মিল ম্যানেজার। মাসের শুরুতে আমাদের হোস্টেলে মিল কমিটির মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে কথা উঠছে যে, সানবিম হক নিরব গত কয়েক মাস থেকে মিল চালায় কিন্তু মিলে কোনো ধরনের টাকা দেয় না। এ অবস্থায় ব্যাচমেট হিসেবে আমাকে বলার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি নিরবকে এ বিষয়ে বললে, সে আমাকে বলে—‘মিলের টাকার কথা তোকে কে বলছে তার নাম বল। তাকে আমি দেখে নিবো। তোদের মিল কমিটি আর রাখবো না, আমি কোনো টাকা দিতে পারবো না, তোরা যা করার করিস।’ শেষে আমাকে বলেছে—‘তুই বেশি বাড়াবাড়ি করতেছিস তোকে প্রফে ফেল করায় দিব।’

এদিকে এসব অভিযোগের ঘটনায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। ওইদিন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ছাত্রদলের বহিষ্কারাদেশ

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শাখা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সানবিম হক নিরব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। ইতোমধ্যে তদন্ত চলছে। তদন্তে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিহত হব।

শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হৃত্বিক হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে নিরবকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে একাডেমিক তদন্ত চলছে। সবারই আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। তদন্ত প্রতিবেদনেই সব জানা যাবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার আলীর মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও ব্যস্ত রয়েছেন জানিয়ে তিনি কল কেটে দেন। তদন্ত কমিটির সদস্য ও ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. রোকন উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান। আশা করছি, দ্রুতই আমরা প্রতিবেদন জমা দেব।