রূপসা নদীর ওপর নির্মিত খানজাহান আলী সেতু থেকে উত্তরের সংযোগ সড়ক দিয়ে প্রবেশ করতে হয় খুলনা মহানগরীতে। শুরুতে বিটুমিনের কাপের্টিং। তবে ১০০ গজ এগোতেই থমকে দাঁড়াতে হয়। সড়কটির মাঝখানে প্রায় ৫০-৬০ ফুট অংশ হঠাৎ যেন উধাও হয়ে গেছে। বিটুমিন তো দূরের কথা, ইটের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কাদামাটিতে ট্রাক আসা-যাওয়ার কারণে পুরো সড়ক চষা ক্ষেতের রূপ নিয়েছে।
খুলনা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ শিপইয়ার্ড সড়কের রূপসা সেতু সংযোগ অংশের দৃশ্য এটি। নগরীর রূপসা, লবণচরা এলাকার শতাধিক স’মিল, চালকল, তুষ মিল, বালুর গোলা, এসআরবি-৬ সদরদপ্তর, নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটি সোলাম, রিভারভিউ পার্কসহ মাথাভাঙা এলাকার লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের অন্যতম সড়ক এটি। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সড়কটি ভাঙাচোরা। এটি প্রশস্ত করতে ২০১৩ সালে প্রকল্প নিয়েছিল খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। ১৩ বছরে সেই কাজ শেষ হয়নি। কমেনি মানুষের দুর্ভোগও। ঠিকাদার বাতিলসংক্রান্ত জটিলতায় এক বছর ধরে সড়কটির কাজ পুরোপুরি বন্ধ। গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এই সড়কের আশপাশে অবস্থান করেন এ প্রতিবেদক। ‘চষা ক্ষেত’, পানি জমে থাকা ‘পুকুর’ পার হয়ে লবণচরা আসতে দেখা যায়, ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কিছু স্থানে ইটের টুকরো ফেলে সেই গর্ত ভরাট করেছেন স্থানীয় লোকজন। এতে অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। ওই অংশে হেলে-দুলে চলতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে।
পুনর্নির্মাণের জন্য সড়কের কিছু জায়গায় ইট-পাথর ফেলেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বৃষ্টিতে ইটের টুকরো সরে গিয়ে বেশকিছু জায়গায় গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্ত দিয়ে গাড়ি চলায় সেটি দিন দিন বড় হয়েছে। এর মধ্যে বর্ষাকাল চলে আসায় সেই গর্ত ডোবায় রূপ নিয়েছে। পুরো সড়কে এমন ডোবার সংখ্যা গুণে শেষ করা যায়নি।
কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, ডোবা-গর্ত এড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৭৮ কিলোমিটার সড়কটি ইজিবাইকে পাড়ি দিতে প্রতিবেদকের সময় লেগেছে ২৯ মিনিট। কোমরের অবস্থা তখন শোচনীয়। রূপসার কাছে দাদা ম্যাচ মিল মসজিদের কাছে চায়ের দোকানে সেই আলোচনা তুলতে চালকল শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘একদিনেই মাজা ব্যতা? আর আমাগো পেততিক দিন আওন-যাওন লাগে। আইতে-যাইতে জান বাইরাই যায়।’
কিছু অংশে ইজিবাইক চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেতুর নিচ দিয়ে ওপারে যান এ প্রতিবেদক। এ সময় চোখে পড়ে আরও করুণ চিত্র। সড়কের ৭০-৮০ ফুট অংশজুড়ে বিশাল গর্ত। এটি যেন পুকুরের মতো। লাঠি দিয়ে গভীরতা মেপে দেখা যায়, ১৭ ইঞ্চি।
কাজ শেষ হয়নি, বেড়েছে খরচ
২০১৩ সালের ৭ মে সড়কটি চার লেনে প্রশস্ত করে পুনর্নির্মাণের জন্য ৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়। দীর্ঘ ৯ বছর পর ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কার্যাদেশ দেয় কেডিএ। ওই বছর ২০ জানুয়ারি কাজ শুরু করে তারা। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে অর্ধেকের বেশি কাজ শেষ না হওয়া, কাজে ধীরগতি ও অনিয়মের কারণে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। এরপর থেকে সড়কের কাজ বন্ধ।
এদিকে সড়কটির কাজ শেষ না হলেও দফায় দফায় খরচ বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রথম দফা প্রকল্প সংশোধনের সময় খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি টাকায়। ২০২৬ সালে আবারও সংশোধন করে খরচ ২৮০ কোটি টাকা করা হয়। গত ৯ জুন একনেক সভায় সেই প্রকল্প আটকে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৩ বছরেও প্রকল্প শেষ না হওয়ায় কার গাফিলতি রয়েছে–খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন তিনি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গত ৩১ আগস্ট প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে ১৪ জনকে দায়ী করে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হয়।
জনতার প্রতিবাদেও কাজ হয়নি
সড়কটি মেরামতের দাবিতে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী এক যুগে মানববন্ধন করেছেন অন্তত ৮ দফায়। মন্ত্রী, উপদেষ্টাদের স্মারকলিপি, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয় (কেডিএ) ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে অসংখ্যবার। এতেও কাজ হয়নি।
সড়কটি পরিদর্শনের সময় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শিপইয়ার্ড সড়কটির দুই পাশে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। আশপাশে এক সময় ২৭টি চালকল ও ২৫০টি কাঠ চেরাইকল ছিল। বান্দাবাজার এলাকায় ছিল ৪৫০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নাজুক সড়কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা। পণ্য পরিবহনে ভোগান্তিসহ নানা কারণে এক যুগে ২১টি চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। কাঠ ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে। ইতোমধ্যে অর্ধেক চেরাইকল বন্ধ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাজী সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ক্ষতি বলে বোঝানো যাবে না। বিক্রি কমে গেছে। অর্ধেকের বেশি ব্যবসায়ী এখন নিঃস্ব।’
কেডিএ চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনার ভাষ্য, রূপসা সেতুর অ্যাপ্রোচ অংশ কংক্রিট দিয়ে করতে হবে, এ জন্য খরচ বেড়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন না হলে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁর আশা, আগামী একনেক বৈঠকে সংশোধনী প্রকল্প অনুমোদন হবে। এরপর দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ করে আগামী বছরের মধ্যে সড়কটির কাজ শেষ করা যাবে।
গত ৬ মাসে দুই দফায় সংসদে সড়কটির দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। তারপরও কাজে গতি আসেনি। সংসদ সদস্য হেলাল বলেন, ‘ওই সড়ক দিয়ে আমাকে বাড়ি ফিরতে হয়। মানুষের কষ্ট আমি বুঝি। অন্যদের সেটি বোঝাতে পারছি না।’