Image description

একসময় দেশের একমাত্র আইসিটি নির্ভর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হিসেবে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানে এখন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট, আবাসন ও অবকাঠামোগত সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের এসব সংকটে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষত্বও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইনস্টিটিউটটির ৬৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। ৯৯টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদের মধ্যে আছেন মাত্র ২৫ জন। সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর জন্য নেই খেলার মাঠ, নেই পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা ও যাত্রী ছাউনি। বছরের পর বছর এসব সংকট চললেও তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দেশের বিশেষায়িত এ প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিজ্ঞাপন

৬৩ শিক্ষক পদের ৪৫টিই শূন্য

২০০৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত প্রচেষ্টায় ফেনী শহরতলীর রানীরহাটের পশ্চিম পাশে দুই একর জমির ওপর কম্পিউটার ইনস্টিটিউটটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে ২০০৬ সালের ৭ জুন তিনি প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। ওই বছর ডেটা টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়। পরে টেলিকমিউনিকেশন টেকনোলজিতেও ডিপ্লোমা চালু করা হয়।

 

 

 

শিক্ষার্থীদের চাহিদা বাড়ায় একপর্যায়ে দ্বিতীয় শিফটও চালু করা হয়। বর্তমানে তিনটি বিষয়ে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে পড়ছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী। প্রতি বছর প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এখানে ভর্তির সুযোগ পান।

বিজ্ঞাপ
 

প্রতিষ্ঠানের মূল ক্যাম্পাসে পাঁচতলা একটি ভবনে শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, ওয়ার্কশপ, ল্যাবরেটরি ও কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। পাশাপাশি ১২০ আসনের পাঁচতলা ছাত্রাবাস, ৮০ শয্যার চারতলা ছাত্রীনিবাস এবং একটি প্রশাসনিক ভবন রয়েছে।

তবে অবকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

 

 

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৬৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। শূন্য ৪৫টি পদ। এর মধ্যে উপাধ্যক্ষের দুটি পদই শূন্য। চিফ ইন্সট্রাক্টরের ১০টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র দুজন। ২৬টি ইন্সট্রাক্টর পদের বিপরীতে আছেন পাঁচজন। আর ২৬টি জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদের মধ্যে কর্মরত ১১ জন।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকটও প্রকট। ৯৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৫ জন। শূন্য রয়েছে ৭৪টি পদ। এর মধ্যে ৬৮টি ক্রাফট ইন্সপেক্টর পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১০ জন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেডিক্যাল অফিসার, ফার্মাসিস্ট, হিসাবরক্ষক, স্টোরকিপার, ড্রাফটসম্যান, অফিস সহকারী, ক্যাশ সরকার, সহকারী বাবুর্চি, বুক সর্টার ও গার্ডেনারের পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব পদে নিয়োগ বা পদায়ন হয়নি।

বিজ্ঞাপন

 

 

 

ছয় বছরেও বেতন পাননি ১৩ শিক্ষক

জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে শুরু হওয়া স্কিলস ফর ইমপ্লিমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শেষ হয়। এরপর ১৫ জন শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত করা হয়। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত তাদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করা হয়।

 

এরপর গত ছয় বছর ধরে তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠান থেকে সামান্য কিছু অর্থ দেওয়া হলেও তাতে যাতায়াত খরচও মেটে না। এরই মধ্যে দুজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়েছেন। বাকি ১৩ জন এখনো সেখানে কাজ করছেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ডেটা টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং টেকনোলজিতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ইলেকট্রিক্যাল ও সিভিল টেকনোলজি চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের কাছে এর গুরুত্ব আরও বাড়ত বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

আবাসন ও সুপেয় পানির সংকট

শুধু শিক্ষক-কর্মচারী সংকট নয়, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনেও রয়েছে নানা ভোগান্তি।

প্রতিষ্ঠানের নামে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে দুই একর জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও এখনো কবুলিয়াত দলিল হয়নি। এর বাইরে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য খেলার মাঠ তৈরিতে আরও এক একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দের অভাবে সেই জমি এখনো পড়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটি চালুর দেড় যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সামনে নির্মাণ করা হয়নি কোনো যাত্রী ছাউনি। ফলে ফেনী-ছাগলনাইয়া সড়কের পাশে রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় শিক্ষার্থীদের।

সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটের পাশাপাশি গভীর নলকূপ না থাকায় সুপেয় পানির সংকটও রয়েছে। সহস্রাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়াবিমুখতা তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
 

তিনি বলেন, ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিকে থাকার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৩০ জন। সিট না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী আশপাশের বিভিন্ন মেস ও মানুষের বাড়িতে থাকছেন। এতে নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের।

সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিশেষায়িত আইসিটি নির্ভর এ প্রতিষ্ঠানটিতে একদিকে পুরোনো সংকট দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সংকটও তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী চাহিদা থাকার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বিষয়ে ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ও বিশেষত্ব ধরে রাখা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ফেনীতে বেগম খালেদা জিয়ার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্ব হারিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে বর্তমান সরকার কাজ করবে বলে তারা আশা করছেন।

 

এ বিষয়ে ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী প্রদীপ্ত খীসা বলেন, ২০০৬ সালের ৭ জুন কলেজটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তখন এটি বাংলাদেশের একমাত্র আইসিটি নির্ভর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো। সরকার এটিকে পুরো পৃথিবীর জন্য একটি মডেল প্রতিষ্ঠান করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় ২১ বছরে তার অগ্রগতি সেভাবে হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমানে অপ্রতুল শিক্ষক-কর্মচারী, অবকাঠামো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনরকম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে আমরা বর্তমানে খুবই আশাবাদী, বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। তার সু-দৃষ্টি এবং সহানুভূতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় সমস্যা সমাধান হবে। আশা করছি, এসব সমস্যা সমাধান হলে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের মডেল পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সারা বাংলাদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।