Image description

চট্টগ্রামে এক রিকশাযাত্রীর পথ আটকে ছিনতাই ও ছুরিকাঘাতের ঘটনা সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পরে এ ঘটনায় সাদ্দাম হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, একসময় মাছের ব্যবসা করতেন সাদ্দাম। তবে জুয়া ও নেশার টাকা জোগাড় করতে পরে ব্যবসা ছেড়ে জড়িয়ে পড়েন ছিনতাইয়ে।

সাদ্দাম হোসেন কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা এলাকার বাসিন্দা। গত রোববার তাঁকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ১০টি মামলা রয়েছে।

পুলিশ জানায়, সাদ্দাম এখন পেশাদার ছিনতাইকারী। তিনি দিনে ঘুমান। ভোরের আলো ফোটার আগেই ছুরি হাতে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর লক্ষ্য থাকে মুঠোফোন ও গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া। কেউ এসব দিতে না চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে ছুরিকাঘাত করেন সাদ্দাম। ছিনতাইয়ের পর সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশায় দ্রুত সটকে পড়েন।

গত শনিবার ভোরে নগরের কোতোয়ালি থানার পেছনে সতীশবাবু লেনে এক রিকশাযাত্রীর পকেট থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় ওই যাত্রীকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ ওঠে সাদ্দামের বিরুদ্ধে। ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করে। এ ঘটনায় শনিবার রাতেই মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে নগরের ১৬ থানায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৮১টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে জুলাইয়ে, ১৫টি। আগস্টে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩টি এবং জানুয়ারিতে ১০টি মামলা হয়েছে। সবচেয়ে কম মামলা হয়েছে মে মাসে, মাত্র তিনটি। নগরের ১৬ থানায় মে মাসে মাত্র তিনটি ছিনতাইয়ের মামলা হওয়ার তথ্য অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন নগরের বাসিন্দারা।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরের নিউমার্কেট, কোতোয়ালি মোড়, সিআরবি, কদমতলী, রেলস্টেশন, সদরঘাট, পাথরঘাটা, লালখান বাজার, কাজীর দেউড়ি, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, চকবাজার, দেওয়ানবাজার, অক্সিজেন মোড়, শেরশাহ, বহদ্দারহাট, ইপিজেড, অলংকার মোড়, ফয়’স লেক, খুলশীসহ অন্তত শতাধিক স্থানে নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কখনো অস্ত্রের মুখে পথচারীকে আটকে, আবার কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে পথচারী কিংবা রিকশার যাত্রীর কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও অন্য জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা।

 

যেভাবে ধরা পড়েন সাদ্দাম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত একটি রিকশায় বসে থাকা এক যাত্রীর ডান পকেট থেকে জোর করে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছেন দুই ব্যক্তি। ওই যাত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘আরে ভাই, দিতাছি তো।’ তিনি নড়াচড়া করলে একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের একজন তাঁর বাঁ পায়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। পরে ছুরি দিয়ে তাঁর পকেট কাটতে দেখা যায়।

জিনিসপত্র দিতে দেরি হলেই ছুরিকাঘাত করেন সাদ্দাম। আঘাতে মানুষ আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, সেটি তিনি বিবেচনায় নেন না। কম সময়ে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। ছিনতাই করা জিনিসপত্র নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করেন তিনি। সেই টাকায় জুয়া খেলেন এবং মাদক সেবন করেন।
শেখ শরীফুল ইসলাম, উপকমিশনার, নগর গোয়েন্দা পুলিশ

ঘটনাটি ঘটে শনিবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, ছিনতাইয়ে অংশ নেওয়া তিনজনের একজন সাদ্দাম। তিনিই রিকশাযাত্রীর বাঁ পায়ে ছুরিকাঘাত করেন।

ভিডিওতে সাদা টি-শার্ট পরা সাদ্দামকে দেখে চিনতে পারেন নগর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আফতাব হোসেন। তিনি আগে কোতোয়ালি থানায় কর্মরত ছিলেন। ভিডিও দেখার পর সাদ্দামের অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়। রোববার বিকেলে কর্ণফুলীর শিকলবাহায় সাদ্দামের বাড়িতে যায় গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। তখন সাদ্দম ঘুমাচ্ছিলেন। বাড়িটি ঘিরে ফেলে সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জিনিসপত্র দিতে দেরি হলেই ছুরিকাঘাত

গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাদ্দাম পুলিশকে জানান, দ্রুত ছিনতাইয়ের কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন তিনি। যাতে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে মানুষ সহজে জিনিসপত্র দিতে চান না। তাই দেরি করলেই ছুরি দিয়ে আঘাত করেন তিনি। ভয়ে তখন মানুষ জিনিসপত্র দিয়ে দেন।

নগর ডিবি পুলিশের উপকমিশনার শেখ শরীফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিনিসপত্র দিতে দেরি হলেই ছুরিকাঘাত করেন সাদ্দাম। আঘাতে মানুষ আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, সেটি তিনি বিবেচনায় নেন না। কম সময়ে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। ছিনতাই করা জিনিসপত্র নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করেন তিনি। সেই টাকায় জুয়া খেলেন এবং মাদক সেবন করেন।’

ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত একটি রিকশায় বসে থাকা এক যাত্রীর ডান পকেট থেকে জোর করে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করছেন দুই ব্যক্তি। ওই যাত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘আরে ভাই, দিতাছি তো।’ তিনি নড়াচড়া করলে একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের একজন তাঁর বাঁ পায়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। পরে ছুরি দিয়ে তাঁর পকেট কাটতে দেখা যায়।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, পড়ালেখা বলতে সাদ্দাম শুধু নিজের নাম লিখতে পারেন। একসময় তিনি বাবার সঙ্গে মাছের ব্যবসা করতেন। পরে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে জুয়া ও নেশায় আসক্ত হন। জুয়ায় টাকা হারানোর পর ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন। একবার গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাইয়ে জড়ান। পুলিশ যাতে সহজে তাঁকে শনাক্ত করতে না পারে, সে জন্য ছিনতাইয়ের সময় ঘটনাস্থলে মুঠোফোন ব্যবহার করেন না তিনি। তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে থাকতেই মুঠোফোন বন্ধ করে দেন।

দিনে ঘুমান, ভোরে ছিনতাই

পুলিশ জানায়, সাদ্দাম দিনের বেলা ঘুমান। আর ভোরে ছিনতাই করেন। সাদ্দাম পুলিশকে জানিয়েছেন, ভোরে রাস্তায় লোকজন কম থাকে। দোকানপাটও বন্ধ থাকে। তবে অফিস ও পোশাক কারখানাগামী মানুষের চলাচল থাকে। এ সময় মুঠোফোন ও গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া যায়। এই দুটি জিনিসই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

শনিবারের ঘটনার আগে ২০২৫ সালের ৮ জুলাই সকাল সাড়ে সাতটার দিকে নগরের টেরিবাজার এলাকায় বীণা দেব নামের এক নারীকে ছুরিকাঘাত করে গলার চেইন ছিনিয়ে নেন সাদ্দাম ও তাঁর সহযোগীরা। ওই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সাদ্দাম। তিন মাস পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আফতাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সাদ্দাম একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। তাঁর অন্য কোনো পেশা নেই। ছিনতাইয়ের টাকায় জুয়া খেলেন এবং মাদক সেবন করেন। এ জন্য ছিনতাই করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে চান না তিনি।