Image description

ব্যাগ হাতে কারওয়ান বাজারে ঢুকেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম। সঙ্গে ছিল সীমিত টাকা। ভাবনা ছিল, হয়তো গত সপ্তাহের মতোই শেষ করতে পারবেন কেনাকাটা। কিন্তু এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতেই বদলে যেতে থাকে হিসাব। এক কেজি তেল, কিছু সবজি, মসলা আর ডিম কিনতেই ফুরিয়ে গেল টাকা। কিন্তু তালিকার অনেক কিছুই তখনো কেনা বাকি। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিফুল বলছিলেন, ‘কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না। টাকা তো তেমন পাই না। প্রতিদিনই বাড়ছে কোনো না কোনো জিনিসের দাম। ঢাকা শহরে থাকাটাই আমাদের জন্য কষ্টকর।’

আরিফুলের এই হিসাব এখন অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পর যে বাজারের তালিকা তৈরি হয়, মাসের শেষদিকে কাটছাঁট করতে হয় তা। অর্থাভাবে বাদ পড়ে অনেক প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাবারের নাম। মাছ-মাংসের পরিমাণ কমছে, সবজির তালিকা ছোট হচ্ছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের চেয়ে কম পরিমাণে পণ্য কিনে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন ক্রেতারা।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রকাশিত বাজারদর বিশ্লেষণ করে নিত্যপণ্যের বাজারে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। বাজারে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি। কয়েকটির দাম এক বছর আগের তুলনায় কমেছে। তবে আটা-ময়দা, ভোজ্য তেল, রসুন, তেজপাতা, বেগুনসহ বেশ কিছু পণ্যের বাড়তি দাম চাপ তৈরি করছে সামগ্রিক বাজার খরচে।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর-৬, মোহাম্মদপুর টাউন হল, নিউ মার্কেট, রামপুরা ও মহাখালী বাজারে বর্তমানে খোলা আটা কেজিপ্রতি ৫০ টাকা এবং প্যাকেট আটা ৬০-৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দা ৭০ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৮০-৯০ টাকা। এক মাস আগে প্যাকেট ময়দার দাম ছিল ৭৫-৮৫ টাকা। রান্নাঘরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ভোজ্য তেলের দামেও স্বস্তি নেই। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকা, দুই লিটার ৪১০ টাকা এবং পাঁচ লিটার এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বছর আগে এসব তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৮৮-১৯০, ৩৭৫-৩৭৮ ও ৮৯০-৯২০ টাকা।

 

 

মসলার বাজারে রসুন ও তেজপাতার দামও বাড়তি। আমদানি করা রসুন ১৮০-২০০ টাকা এবং দেশি রসুন ১০০-১২০ টাকা কেজি। তেজপাতা বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা কেজি, যেখানে এক বছর আগে দাম ছিল ২০০-২২৫ টাকা। সবজির বাজারে ঢুকলেও একই প্রশ্ন— কী কিনবেন, আর কী বাদ দেবেন? কাঁচা মরিচ ১২০-১৬০, বেগুন ৯০-১২০ ও শসা ৫০-৮০ টাকা কেজি। তবে এক বছর আগে কাঁচা মরিচের দাম আরও বেশি ছিল, ১৮০-২২০ টাকা। বেগুনও ছিল ৫০-১০০ টাকা কেজি। বাজারে কিছু পণ্যে স্বস্তি ফিরলেও সেই স্বস্তি সামলাতে পারছে না সব পণ্যের বাড়তি দামের চাপ।

চাল ও ডালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল। সরু চাল ৭০-৮৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৫-৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০-৫৫ টাকা কেজি। মসুর ডাল বড় দানা ৯৫-১০০, মাঝারি ১১৫-১২০ ও ছোট দানা ১৫০-১৬০ টাকা কেজি। মাছ-মাংসের বাজারে অবশ্য হিসাব আরও কঠিন। রুই মাছ ৩০০-৪৫০, গরুর মাংস ৭৮০-৮৫০, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ঊর্ধ্বে। ব্রয়লার মুরগি ১৮০-২০০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০-৭৫০ টাকা কেজি। ফার্মের ডিমও বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫৫ টাকা হালি। তবে বিক্রেতাদেরও রয়েছে নিজেদের হিসাব।

 

কারওয়ান বাজারের মামা-ভাগিনা কিচেন মার্কেটের বিক্রেতা রবিন মিয়া বললেন, ‘মুরগি যে দামে নিছি, সেই দামেই বিক্রি করছি। গতকাল সোনালি ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা এবং ব্রয়লার ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা ছিল।’ ক্রেতার চোখে দাম বেশি হলেও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন না; পাইকারি বাজারে যে দামে পণ্য কিনছেন, তার সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করেই বিক্রি করছেন।

এদিকে, সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে ক্রেতাদের সামনে পড়ছে অন্য বাস্তবতা। আয় নির্দিষ্ট, কিন্তু বাজারের খরচ নির্দিষ্ট নয়। একদিকে তেল-মসলা-সবজির দাম, অন্যদিকে মাছ-মাংস-ডিমের খরচ— সব মিলিয়ে মাসের বাজারের বাজেট বারবার ভেঙে যাচ্ছে। চিনি ১১০-১১৫, আয়োডিনযুক্ত লবণ ৪০-৪২ ও গুঁড়া দুধ ৮৩০-৯৬০ টাকা কেজি। এসব পণ্যের দামও পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ের অংশ। ফলে একটি পণ্যের দাম কমলেও অন্য কয়েকটি পণ্যের বাড়তি দাম সেই সুবিধা অনেকটাই মুছে দিচ্ছে।