মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। সদ্য অপসারিত উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে মঙ্গলবার দিনভর ক্যাম্পাসে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। মূল ফটকে তালা দিয়ে অবস্থান নেওয়ায় বন্ধ থাকে ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম। স্থবির হয়ে পড়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমও।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা দিয়ে কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। দিনভর সেখানে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। তবে নিরাপত্তা শাখা ও মেডিকেল সেবা কর্মসূচির আওতামুক্ত রাখা হয়।
আন্দোলনে থাকা চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাসেল বলেন, আমরা সায়েম স্যারকে উপাচার্য হিসেবে চাই। এটাই আমাদের একমাত্র দাবি। তিনি তার পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন, তারপর যাবেন। এর আগে নয়। এই দাবিতে আমরা আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে উপাচার্য ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন চুয়েট শিক্ষক সমিতির শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় সদ্য সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনিও সেই দাবির সঙ্গে একমত।
মানববন্ধনে পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক বশির জিসান বলেন, চুয়েট ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এমন আন্দোলন তিনি দেখেননি। অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁকে কেন অপসারণ করা হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। নতুন প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিও জানান তিনি।
স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান বলেন, উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ায় শিক্ষকরা সংক্ষুব্ধ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কোনো উপাচার্য বা শিক্ষকের জন্য শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কার্যক্রম বিরল। দায়িত্ব নেওয়ার ১ মাস ২২ দিনের মধ্যে কেন তাকে সরানো হলো, তার যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. আহসান উল্লাহ বলেন, সদ্য সাবেক উপাচার্য ভালোভাবেই দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং তাকে সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এভাবে অপসারণ মেনে নেওয়া যায় না। তিনি অধ্যাপক সায়েমের পুনর্বহালের দাবি জানান।
এর আগে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্বাধীনতা চত্বর থেকে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, ছাত্রী হল ও শিক্ষক আবাসিক এলাকা প্রদক্ষিণ করে রাত ১২টার দিকে স্বাধীনতা চত্বরে ফিরে আসে। পরে প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন শিক্ষার্থীরা। রাত ৮টার দিকে ছাত্রীদের আবাসিক হল বন্ধ হয়ে গেলেও রাত ১১টার দিকে অনেক ছাত্রী হল থেকে বের হয়ে মিছিলে যোগ দেন।
মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার ও সিফাত-এ নূর-সাবিহা।
লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের আপত্তি নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; অধ্যাপক সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কোনো দৃশ্যমান ব্যাখ্যা ছাড়াই পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন তারা।
এক প্রশ্নের জবাবে আহনাফ শাহরিয়ার বলেন, আমরা উপাচার্য হিসেবে সায়েম স্যারকেই চাই। এই দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি চলবে।
চুয়েট সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। সোমবার তাকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপরই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।