রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে শিক্ষার্থীদের ‘ব্যাড টাচ’ টিজিং ও যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং ধর্ষণেরও অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে এসব অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং এ ধরনের গুরুতর অপরাধে দায়ী শিক্ষকরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আক্তারুজ্জামানই স্বয়ং এসব অপরাধী শিক্ষককে ছাড় দিচ্ছেন এবং আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক এবং সেখানকার স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিবর্গেরও অনেকে এমন অভিযোগ করেছেন এ প্রতিবেদকের কাছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিষয়ের অধ্যাপক মো. বেলায়েত হোসেন মোল্যা একাধিক ঘটনায় ছাত্রীদের ‘ব্যাড টাচ’, টিজিং ও যৌন হয়রানি করেছেন।
একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রী এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক মো. হুমায়ূন কবীরের বিরুদ্ধে ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে, তদন্তের পর সেই অভিযোগের প্রমাণও মিলে। এই একই শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহকর্মীর স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। তদন্তে এমন অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।
এছাড়া মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক এ কে এম আতাউল কবির চৌধুরী ছাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই অসদাচরণ করেন। এক ছাত্রীর অভিযোগ কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়ে তদন্ত করলে তারও প্রমাণ মিলে।
অভিযোগ রয়েছে, মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির মতো মারাত্মক অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এসব শিক্ষককে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন স্বয়ং গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আক্তারুজ্জামান। এই মহলটি এক ডিলে দুই পাখি শিকার করতে চাইছে। তা হচ্ছে- অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন, এতে অপরাধের প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ফলে এই অপরাধী শিক্ষকরা অধ্যক্ষের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এই শিক্ষকরাই বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় ভুল তথ্য দিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনে লিপ্ত হন। কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য ছড়ান এরা। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন বিভিন্ন দফতরে এরা মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অধ্যক্ষকে সরাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কারণ, আমিনুল হককে অধ্যক্ষ পদ থেকে সরাতে পারলে বাধাহীন অপরাধকর্ম তারা চালিয়ে যেতে পারবেন এবং নিজেদের অপরাধগুলোও আড়াল করা সহজ হবে। আর এই অপরাধী চক্রের উদ্যোগ সফল করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আক্তারুজ্জামান। সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে সভা ডেকে আমিনুল হককে অধ্যক্ষ পদ থেকে সরানোর ব্যবস্থা করেন সভাপতি। এর মাধ্যমে তিনি কলেজটির ওপর নিজের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক মো. হুমায়ূন কবীরের বিরুদ্ধে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ পাওয়া উঠে। ২০ জুলাই ২০২৩ রাত ২টার দিকে ছাত্রীর সঙ্গে ওই শিক্ষক মেসে থাকাকালে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে এবং পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে। জানা গেছে, মো. হুমায়ূন কবীর ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। তার দু’টি সন্তানও রয়েছে। কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীর (বয়স তৎকালীন সময়-১৬/১৭) সঙ্গে দীর্ঘ দেড় বছর অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যান তিনি ২০/০৭/২০২৩ তারিখ রাত ২ টায় উক্ত প্রভাষকের মেস বাসায় তার স্ত্রী এসে ওই ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো অবস্থায় হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ওই সময় বাড়িওয়ালাসহ আশপাশের লোকেরা বিষয়টি জানেন। ঘটনা জানাজানি হলে ডিআইএ’র তদন্তে এই ঘটনা প্রমাণিতও হয়। এই একই শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহকর্মীর স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টারও অভিযোগ ওঠে। তদন্তে সেই অভিযোগেও প্রমাণিত হয়। এসব কারণে মো. হুমায়ূন কবীর কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছেন। অথচ এই শিক্ষক এখনও বহাল-তবিয়তেই আছেন সভাপতি মো. আক্তারুজ্জামানের পৃষ্ঠপোষকতায়।
মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থী জাওয়াতা আফনান, রোল-২২০০৩-এর সঙ্গে গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক এ কে এম আতাউল কবির চৌধুরীর শ্রেণিকক্ষে অসদাচরণের অভিযোগ উঠে। শিক্ষার্থীর বাবা এ কে এম পারভেজ মৌখিকভাবে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগকারী শিক্ষার্থী জাওয়াতা আফনানের ভাষ্য, শিক্ষক আতাউল কবির চৌধুরী ২৮ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও বাক-বিতণ্ডার একপর্যায়ে শিক্ষক হাজিরা খাতা তার গায়ে ছুঁড়ে দেন। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত উপ-কমিটি সেদিন ক্লাসে উপস্থিত ১৩ জন শিক্ষার্থীর বক্তব্য নেয়। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার কারণ জানতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষক আতাউল কবির চৌধুরী ওই শিক্ষার্থীর ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে জাওয়াতা আফনান ও শিক্ষকের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। তখন শিক্ষক হাজিরা খাতাটি ছুড়ে দিয়ে বলেন ‘দেখ, সে উপস্থিত ছিল কি-না’। তদন্ত কমিটির কাছে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, খাতাটি জাওয়াতা আফনানের গায়ে লেগেছিল। যা ওই শিক্ষার্থী ও তার সহপাঠীরা ভালোভাবে নেয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে শিক্ষক এ কে এম আতাউল কবির চৌধুরী কর্তৃক খাতা ছুড়ে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য শিক্ষককে ৩০ কার্যদিবস শ্রেণি কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া কলেজের ব্যবস্থাপনা বিষয়ের অধ্যাপক মো. বেলায়েত হোসেন মোল্যার বিরুদ্ধে ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীকে ‘ব্যাড টাচ’, টিজিং ও যৌন হয়রানিমূলক আচরণের অভিযোগ উঠে। ভুক্তভোগী ছাত্রীরা বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে ছাত্রীরা বেলায়েত হোসেন মোল্যার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের ‘ব্যাড টাচ’, টিজিং ও যৌন হয়রানির অভিযোগ জানান।
অধ্যাপক মো. বেলায়েত হোসেন মোল্যা, প্রভাষক মো. হুমায়ূন কবীর ও প্রভাষক এ কে এম আতাউল কবির চৌধুরী প্রমুখ দীর্ঘদিন ধরে কলেজটিতে নানা অপরাধে জড়িত থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে থাকেন। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পূর্বে ও পরে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া শিক্ষকদের একটি অংশের বিরোধিতায় পড়েন অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক। এই চক্রের অশুভ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ২৫ জুলাই ২০২৬ গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আক্তারুজ্জামান বিধিবহির্ভুতভাবে কলেজ প্রাঙ্গণের বাইরে গভর্নিং বডির সভা ডেকে অধ্যক্ষকে এক মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে ছুটিতে পাঠান। যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
শীর্ষনিউজ