‘শুক্রবার মেহেদি নামের ওর এক রুমমেট কল দেয় যে পার্টি হবে রাতে, চলে আয়। বিকেল ৪টার ট্রেনে আজমল চলে যায় খুলনায়। রাত ১২টার সময় আমার কাকার মানে আজমলের আব্বার কাছে আজমলের নম্বর থেকে কল আসে যে, আপনার ছেলে মিল না দিয়ে ভাত খেয়েছে। সেটা আমরা ধরে ফেলেছি। আর ইতোপূর্বে হয়ত যা কিছু ঘটেছে, সেই পারপাসে তার কাছে আমরা ১ লাখের ওপর টাকা পাব। আপনি টাকা নিয়ে দ্রুত চলে আসেন।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি মেসে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার আগের ঘটনার এভাবেই বর্ণনা দিচ্ছিলেন তার চাচাতো ভাই রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাকু তখন ফোনে বলেছিল, তোমরা কিছু করো না। আমি টাকা নিয়ে আসছি। ভোরে কাকু যখন ওখানে পৌঁছায় তখন স্থানীয় লোকজন বলে, এখানে একজন মারা গেছে, ওইটা কি আপনার ছেলে? তখন বুঝতে পারে যে সে মারা গেছে।’ রাকিবের ভাষ্য, ‘‘আমরা এখনো পর্যন্ত সঠিক কারণ পর্যন্ত হয়ত পৌঁছাতে পারিনি। তবে যেটুকু ঘটেছে, সেটুকু বলতে পারি।’
আজমুল হোসেন ওরফে আযমকে (২৩) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় একের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে আজমুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় করুন দৃশ্য। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় আজমুল হোসেনের মা আসমা বেগম।
‘রাতে ১২টার দিকে আমার ছেলের নম্বর থেকে মেহেদী নামে একটি ছেলে আমার সাথে কথা বলে। আমার ছেলের কান্নার শুনে আমি বুঝতে পারছি, কিছু একটা হয়েছে। মেহেদী বলে আপনাকে ১ লাখ টাকা দিতে হবে। ছেলেকে যদি চান, তাহলে টাকা নিয়ে এখনই আসেন’ -আজমল হোসেনের বাবা কুতুব উদ্দীন
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বাড়ি এসছিল আমার ছেলে, শুক্রবার আবার চলে যায়। রাতে সাড়ে ৮টার দিকেও আমাদের সাথে কথা হয়। সে টউশনি করাতো, সেখান থেকে ফিরে মেসে যাচ্ছিল বলে জানায়। শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফোন আসে আমার ছেলের নাম্বার থেকেই। তখন সে জানায়, আব্বু আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মারছে। তখন পাশ থেকে আরেকজন ফোন নিয়ে আমাদের কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করে। বলার পর থেকেই আমার ছেলের সাথে আমাদের আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাথার চুল একটু কাটা। পচা কাবারির বাঁশ নিয়ে ছাদ থেকে ফেলে বলেছে আমরা চড়-থাপ্পর মেরেছি, মারার পরে আপনার ছেলে চারতলা থেকে ঝাপ দিয়েছে। আসলে তা নয়। আমার আমার ছেলের পুরো শরীরজুড়ে মারের দাগ। সামনে থেকে পড়ে মরলে তার লাঞ্চ, মুখ তো ভালো থাকবে না। তার ক্ষত তো সামনে থেকে হবে। আমার বিটার গায়ে ঠেঙিয়ে মারা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিটার পুরো শরীর আমি দেখেছি। আমি মা, আমি সহ্য করতে পারছিনা।’ এভাবে বলতে বলতে কেঁদে ওঠেন আজমুলের মা। খানিক পরে আবার তিনি বলেন, ‘আমার বিটার পা দুই জায়গায় ভাঙা। রড দিয়ে কান চওলে বাড়ি মারা হয়েছে। তার সমস্ত শরীর চেচা। যারা তাকে ধুয়েছে (গোসল) তারা বলছে সে ছাদ থেকে পড়ে মরেনি। তাকে চেচে মারা হয়েছে। পায়ের চামড়া তোলা। পায়ে ভাঙা। তার বা হাত ভাঙা। তার দুই দাবনায় ঠেঙানো হয়েছে।’
আজমলের বাবা কুতুব উদ্দীন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার সে বাড়ি আসে। শুক্রবার ক্লাসের কথা বলে চলে যায়। রাত ৯টার সময়ও তার সাথে কথা হলো। তিনি বলেন, ‘রাতে ১২টার দিকে আমার ছেলের নম্বর থেকে মেহেদী নামে একটি ছেলে আমার সাথে কথা বলে। আমার ছেলের কান্নার শুনে আমি বুঝতে পারছি, কিছু একটা হয়েছে। মেহেদী বলে আপনাকে ১ লাখ টাকা দিতে হবে। ছেলেকে যদি চান, তাহলে টাকা নিয়ে এখনই আসেন।’
‘আমি বললাম রাত হয়ে গেছে অনেক, সকালে আসলে কি হবে? মেহেদী বলে না, আপনার ছেলের ভালো চাইলে দ্রুত চলে আসেন। মেহেদী তখন আরও বলে, তুমি ট্রেনে আসবা না প্লেনে আসবা তোমার ব্যাপার, দ্রুত আসো। তখন আমি বলি আমি আসছি। এই মেহেদী যে এতোবড় কাল হবে, তা আমি কল্পনা করতেও পারিনি। আমি অনেকবার মোবাইলে চেষ্টা করেছি, সে ফোন রিসিভ করিনি’, যোগ করেন তিনি।
কুতুব উদ্দীন আরও বলেন, ‘শনিবার ভোর ৬টায় আমি সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। একজন চাচা বলে, তোমরা কাকে খুঁজছো? তোমার বাড়ি কোথায়? তখন আমি বলি, আমার বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। তখন সেই চাচা বলে, তোমার ছেলে মারা গেছে। তোমার ছেলের নাম আজমল না? আমি বললাম জ্বি চাচা। ওই চাচা আমাকে বলেছে, ওরা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিতভাবে তোমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। ওরা তলায় এনে রেখে বলছে ছাদ থেকে পড়ে মরে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার ছেলের রুমেও গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, বালিশ-কাঁথা সব আওলানো। সে কত চিল্লানো চিল্লাইছে, আল্লাহ জানে...।’ এ সময় আজমলের প্রতিবেশী ইছাহাক বলেন, ‘এত ভালো ছেলে। সে সবার সাথে মিশে থাকত। দশ বেলা না খেয়ে থাকলেও টু শব্দ করার ছেলে সে ছিল না। সে ভাত চুরি করে কেন খাবে? এইটা মিথ্যা অপবাদ।’
আজমলের গ্রামের বন্ধু সোহানুর রহমান বলেন, ‘আজমল একটা ভালো ছেলে। সে ভদ্র এবং নম্র। মিথ্যা কথা বলত না। সে ভাত চুরি করে কেন খাবে?’
উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন ওরফে আযমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গত শনিবার রাতে আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বাদী হয়ে হত্যা মামলাটি করেন। এতে চারজনের নাম উল্লেখসহ আরও ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের চারতলা একটি মেসে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।