একদল শিশু হইহই করে হাসতে হাসতে আসছে। স্কুল ছুটি হয়েছে। দুপুরের রোদ। চওড়া একটা রাস্তা হাঁটার জন্য, পাশে সাইকেলের জায়গা। চারপাশ যেন শিশুদের কথা বলতে দিচ্ছে। কোনো হর্ন নেই, কোনো বকবক নেই। এরপর রাস্তা ক্রসিং। সব গাড়ি টনটন করে সতর্ক। সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা এগিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা দল বেঁধে রাস্তা পার হচ্ছে, মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে আমরাও চোখমন নরম করে এর উত্তর দিচ্ছি। মানুষের দুনিয়াটা বোধহয় এমনই হওয়ার কথা।
একটা রাষ্ট্র কতটুকু মানব-উপযোগী, তা শিশুদের চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। একটা সমাজ কতটা সমাজ হতে পেরেছে, তা বুঝবেন একজন বড় মানুষ একটি শিশুর সঙ্গে কীভাবে কথা বলে। একটি শিশু রাস্তা পার হলে গাড়ি থামে কি না, ভয় পেলে কোথায় যায়, ‘না’ বললে কেউ সেই ‘না’ শোনে কি না, বিকালে বের হলে আবার বাড়ি ফিরতে পারে কি না— এসবের মধ্যেই রাষ্ট্রের চরিত্র লেখা থাকে। জাপানে গিয়ে আমি প্রথম বুঝলাম, শিশু একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। সমাজ, রাষ্ট্র, রাস্তা— সবকিছুর পরিকল্পনার মধ্যেই শিশুটিকে ধরে নেওয়া হয়েছে। নৃবিজ্ঞানী হিসেবে বুঝি, মানুষ নির্মিত হয়। একটি শরীরের মর্যাদা আছে— এটিও শেখানো হয়।
তারপর নিজের দেশের দিকে তাকাই। আমাদের কি একটা দেশ আছে? রাষ্ট্র কিংবা সমাজ? অপ্রতিমের ছবি তুলতে বের হওয়ার কথা ছিল। তার বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। তেরো বছরের একটি শিশুর জন্য এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কী হতে পারে? অথচ অপ্রতিম একা নয়। প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে; নানা ধরনের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৫৫ শিশু। বছরের প্রথম সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন তখনো নিখোঁজ ছিল। ২ হাজার ৩৮— সংখ্যাটি একটু থেমে পড়ুন। ২ হাজার ৩৮টি বাড়ি, ২ হাজার ৩৮টি অপেক্ষা। একটি সংখ্যা কত মানুষের জীবন বহন করে, আমরা দ্রুত ভুলে যাই।
আমরা অবশ্য খুব দ্রুত ব্যাখ্যাও বের করে ফেলি। ছেলেমেয়েরা মোবাইলে থাকে, সোশ্যাল মিডিয়া নষ্ট করছে, কিশোররা গ্যাং করছে, মাদক নিচ্ছে। বাস্তব সংকট আছে। কিন্তু বড় সত্যটাকে এসব দিয়ে ঢেকে ফেললে চলবে না। আমরা শিশুদের জন্য কী রেখেছি? খেলার মাঠ? নিরাপদ ফুটপাত? লাইব্রেরি? বিকালে হাঁটার জায়গা? এমন পরিবার, যেখানে সন্তান দ্বিমত করতে পারে? এমন স্কুল, যেখানে নম্বর ছাড়া তারও মূল্য আছে? আমরা মাঠ নিয়ে নিয়েছি, রাস্তা নিয়ে নিয়েছি, সময় নিয়ে নিয়েছি, শরীরের ওপর অধিকার নিয়ে নিয়েছি। তারপর একটি ছোট স্ক্রিনে সে নিজের পৃথিবী খুঁজলে স্ক্রিনটাকেই গালি দিই। আমরা শিশুদের অন্তর্জগৎ আর বহির্জগৎকে হিংস্র জঙ্গলে পরিণত করেছি।
কিশোর গ্যাংয়ের কথাও এমনভাবে বলি, যেন কিছু কিশোর নিজেরাই অপরাধের প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছে। অথচ গ্যাং কখনো কখনো belonging-এরও সংগঠন— আমি কার, কে আমার, কে পাশে দাঁড়াবে, কোথায় আমি গুরুত্বপূর্ণ? সমাজ এসব প্রশ্নের সুস্থ উত্তর না দিলে অন্য কেউ দেবে— কখনো ‘বড় ভাই’, কখনো গ্যাং, কখনো মাদক। কোনো কিশোর মাদকে গেলে তাই শুধু ‘নষ্ট হয়ে গেছে’ বললে আমার প্রশ্ন থেকে যায়— নষ্ট হওয়ার আগে কী হয়েছিল? আমরা সবসময় শেষ দৃশ্যটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি; আগের দৃশ্যগুলো অক্ষত রাখি।
আমাদের শিশুদের মন আর দেহ সেই কত আগে থেকেই রাষ্ট্রের বাজেট, পরিবারের ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম আর রাজনীতির আঁস্তাকুড়ে পড়ে আছে। শিশুকে অপমান করা হয়, মারলে বলি শাসন, ভয় দেখালে বলি মানুষ করছি। আমরা মনে করি শিশুরা চটজলদি বড় হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। যদিও হয় না। আমাদের চারপাশ ভরে থাকে ট্রমাগ্রস্ত শিশুতে। তারা বয়সে বড় হয়, তারপর আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি— মানুষ এত হিংস্র কেন? রাজনীতি এত নিষ্ঠুর কেন? যে শিশু শিখেছে শক্তিশালী মানুষের সামনে চুপ থাকতে হয়, মার হলো শাসন, অপমান হলো শিক্ষা, ভয় হলো ভদ্রতা আর প্রশ্ন হলো অবাধ্যতা— সে আঠারো বছর বয়স হলেই হঠাৎ গণতান্ত্রিক মানুষ হয়ে যাবে কেন? শৈশবই তো আমাদের প্রথম রাজনৈতিক বিদ্যালয়।
এ কারণেই আমার মনে হয়, আমাদের প্রচলিত রাজনীতির প্রায় পুরোটাই শিশুবিরোধী। শিশু বক্তৃতায় আছে— ‘আগামী প্রজন্ম’, ‘দেশের ভবিষ্যৎ’, ‘আগামীর বাংলাদেশ’। কিন্তু বর্তমানের শিশুটি কোথায়? তার ভোট নেই, ফলে তার ফুটপাত, খেলার মাঠ, শরীর, মানসিক স্বাস্থ্য, অবসর, নিরাপত্তা কিংবা গোপনীয়তা— কিছুই বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে না। আমরা শিশুদের ভবিষ্যৎ বলে এমন সময়ে ঠেলে দিই, যেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শৈশবটাই শেষ হয়ে যায়। ভবিষ্যতের নামে বর্তমানটাকে আমরা খেয়ে ফেলি।
তারপর কোনো শিশু খুন হয়। আমরা আন্দোলন করি, ছবি বদলাই, মোমবাতি জ্বালাই, বিচার চাই। কয়েক দিন পর আরেকটি ঘটনা আসে। আরেকটি শিশু, আরেকটি ছবি, আবার বিক্ষোভ। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি এবং দীর্ঘস্থায়ী কাজ তৈরি না হলে বিক্ষোভে কী হয়? যে সমাজ মৃত্যুটিকে সম্ভব করেছিল, সেটি যদি অক্ষত থাকে, তাহলে আমরা একেকটি মৃত্যুর পরে কয়েক দিন শব্দ তৈরি করছি মাত্র। কোথাও যদি সেই মৃত্যু স্থায়ী চিহ্ন রেখে না যায়, আমাদের শোকও ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়। আমরা শোক করি, তারপর স্ক্রল করি। আমরাই তো শৈশবের শত্রু।
এ চরাচরই যেন জীবন্ত বিক্ষোভ। একটি শিশু নিরাপদে রাস্তা পার হতে না পারা বিক্ষোভ। নিজের শরীরের মালিক না হওয়া বিক্ষোভ। দরিদ্র শিশুর শরীরের দাম কম হওয়া বিক্ষোভ। একটি ছেলে কাঁদতে না পারা বিক্ষোভ। একটি মেয়ের নিরাপত্তার নামে তার পৃথিবী ছোট করে দেওয়া বিক্ষোভ। একটি কিশোরের নিজের গুরুত্ব অনুভব করতে গ্যাং দরকার হওয়া বিক্ষোভ। মাদকের ভেতর পৃথিবী থেকে পালাতে চাওয়াও বিক্ষোভ। এসব আলাদা সংকট নয়; একই শিশুবিরোধী সমাজের বিভিন্ন মুখ।
আমরা আন্দোলন করি, সরকার বদলাই, নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, উন্নয়নের গল্প বলি। কিন্তু শিশুদের জন্য পৃথিবী না বদলালে আমাদের রাজনীতি কোথায় পৌঁছায়? অপ্রতিমের বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। শুধু অপ্রতিমের নয়, প্রতিটি শিশুর। একটি শিশু বিকালে বের হবে, বন্ধুদের সঙ্গে থাকবে, ছবি তুলবে, খেলবে, ভুল করবে, একটু দেরি করবে এবং শেষে বাড়ি ফিরে আসবে— একটি মানবিক সমাজে এটুকু কোনো বিলাসিতা হতে পারে না।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। আমি এখন আর কথাটা বিশ্বাস করি না। শিশুরা ভবিষ্যৎ নয়, তারা মানুষ। তাদের ভয়, আনন্দ, কৌতূহল, গোপনীয়তা, অসম্মতি, মর্যাদা ও পৃথিবী দেখার অধিকার আছে। একটি সমাজের পরীক্ষা শুধু ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য কী রেখে যাব তা নয়; আজ তাদের কতটা বাঁচতে দিচ্ছি, সেটিও। আর একটি সমাজ যদি নিজের বর্তমানের এ ছোট মানুষগুলোকেই নিরাপদ রাখতে না পারে, তাহলে যত রাজনীতি, যত উন্নয়ন, যত সভ্যতার কথাই বলি না কেন— কোথাও না কোথাও আমরা এখনো আমাদের শিশুদের ভক্ষণ করেই বেঁচে আছি।
লেখক: ড. মঈন জালাল চৌধুরী,নৃবিজ্ঞানী ও শিক্ষক