Image description

মরিয়ম বুশরার বয়স সবে সাত বছর হয়েছিল। পড়ত প্রথম শ্রেণিতে। বিদ্যালয়ের পাশেই সহপাঠীর বাড়ি। ক্লাস শেষে বান্ধবীকে খুঁজতে তাদের বাড়িতে যায় ছোট্ট শিশুটি। সেখানে পড়ার সাথীকে না পেয়ে ফিরতে চেয়েছিল পরিবারে। কিন্তু পথ আটকান বান্ধবীর বাবা। বাসায় কেউ না থাকায় ধর্ষণ করেন মেয়েটিকে। এরপর ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে শ্বাসরোধে হত্যা। লাশ গুম করতে পুঁতে রাখেন নিজ ঘরের মেঝেতে। গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জের সিধুলী ইউনিয়নের চর লোটাবর গ্রামে ঘটে এ ঘটনা।

আবার সতিনকে মা ডাকায় ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে টাঙ্গাইলের সখীপুরে মো. আশরাফুল নামে তিন বছরের শিশুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে তার জননী আকলিমা বেগম। তার ক্ষোভের আগুনে পোড়ে আট বছরের মেয়ে সিদরাতুলও। ছুরিকাঘাতে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল তাকেও। এরপর আত্মহত্যার চেষ্টা করেন আকলিমা নিজেই। এ ছাড়া সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে তিন শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যার পর নিজেও বিষ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এক বাবা।

এভাবেই প্রতিনিয়ত নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে কোমলমতিরা। যে শৈশবে হাসি, খেলাধুলা আর নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা, সেই শৈশবেই অনেক শিশুর জীবনে নেমে আসছে নির্মমতার অন্ধকার। কখনো ব্যক্তিগত আক্রোশ-লালসা আর প্রতিহিংসার আগুনে, কখনো পারিবারিক কলহের বলি হয়ে, আবার কখনো পরকীয়া কিংবা বড়দের সম্পর্কের জটিলতার বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। যে বয়সে হাতে থাকার কথা খেলনা, সেই বয়সেই কারও কারও জীবনের শেষ ঠিকানা হচ্ছে লাশের মর্গ। ঘরের মানুষই যখন হয়ে ওঠে আতঙ্কের কারণ, তখন হারিয়ে যায় নিরাপদ আশ্রয়টুকুও। শিশুদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে পরিবার ও সমাজে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ, গুলিতে মৃত্যু কিংবা রহস্যজনক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২৫৪ শিশু। তাদের মধ্যে ১৩ বছরের কম বয়সী ১৩৪, অর্থাৎ নিহতের অর্ধেকেরও বেশি। অথচ এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৮১টি। শৈশব রক্ষার বদলে যখন একের পর এক শিশুর জীবনে নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া, তখন প্রশ্ন উঠছে— শিশুরা কি সত্যিই নিরাপদ?

‘গত অাট মাসে ২৫৪ শিশু নিহত। এর মধ্যে ৭৪ জনের বয়স ৬ বছর বা তার কম, ৬০ জনের ৭ থেকে ১২ বছর, ১১০ জনের বয়স ১৩ থেকে ১৮। অর্থাৎ ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুই ২৫৪ জনের মধ্যে ১৩৪, প্রায় ৫৩ শতাংশ। আসকের তথ্যমতে, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৪ শিশুকে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের বয়স ৬ বছর বা কম, ১১ জনের ৭ থেকে ১২ এবং ছয়জনের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭টি। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করার পর হত্যা করা হয়েছে আরও চার শিশুকে। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছে দুই শিশু। আর পুরুষের ধর্ষণের পর প্রাণ গেছে দুই ছেলে শিশুর’— উল্লেখ করা হয় আসকের প্রতিবেদনে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতনের পর নিহত হয়েছে ৬৮ শিশু এবং পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনের পর মারা গেছে আরও ৪৯ শিশু। নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জনের বয়স ৬ বছর বা কম, ১১ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ এবং ১০ জনের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। আরও দুজনের বয়স উল্লেখ নেই। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১২টি।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সমাজে বাড়তে থাকা অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। আর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা ও মানসিক সংকট থেকেও মানুষের আচরণে ভয়াবহ পরিবর্তন আসতে পারে। সব মিলিয়ে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা এখন শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর কোনো সন্ধানই মেলেনি।

আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেছেন, শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সংবিধান, জাতীয় শিশু নীতি, শিশু আইন এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালনে নিতে হবে কার্যকর ব্যবস্থা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত আট মাসে ১৪ হাজার ৬০২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১টি, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫টি, এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি, মে মাসে ১ হাজার ৯৫২টি, জুনে ২ হাজার ২০০টি, জুলাইয়ে ২ হাজার ৩৩৬টি এবং আগস্টে ২ হাজার ১৫৬টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, সাম্প্রতিক শিশু নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনাগুলো তৈরি করেছে নতুন ধরনের উদ্বেগ। এসব অপরাধের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে অপরাধের ধরন ও প্রবণতা শনাক্ত করতে হবে। সেই ট্রেন্ড অ্যানালাইসিসের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষায় বিশেষায়িত দক্ষ ইউনিট গঠন করা জরুরি। অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনতে হবে, যাতে একই অপরাধ পুনরাবৃত্তির সুযোগ না পায়। তবে বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানি বা শাস্তির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আরও যারা নৃশংসতার শিকার: কুমিল্লায় নিখোঁজের পরদিন গত শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা জঙ্গলে মেলে শিশু অপ্রতিমের নিথর দেহ। এ ঘটনার দুদিন আগে বৃহস্পতিবার বাড়ির পাশের ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলির মরদেহ। গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকালে নিখোঁজ হয়েছিল মেয়েটি। শিশুটিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে বাড়িতে রেখে দেয় দুই অভিযুক্ত। পরে মরদেহের গন্ধ ছড়ালে সেটিকে বাড়ির পাশের ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে তল্লাশি করলে একটি ঘর থেকে গন্ধ পায় এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

আট বছরের রামিসা আক্তার পল্লবীর একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত। গত ১৯ মে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে উঠে আসে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং মরদেহ টুকরো করে গোপন করার চেষ্টাও হয়েছিল। এই মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ৭ জুন মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। বিষয়টি নিয়ে দেশ জুড়ে চাঞ্চল্যের মধ্যেই চট্টগ্রামের পাঁচ বছরের শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর হত্যা করে ছয় টুকরো মরদেহ নালা ও সাগরে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা।

সিলেটের কানাইঘাটে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মুনতাহা আক্তার জেরিনকে। মাগুরা শহরে বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সারা দেশে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে ওঠে। চলতি বছরের মে মাসে সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলা এলাকায় চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, মানুষ যখন মনে করতে শুরু করে যে তার সন্তান কিংবা পরিবারের সদস্য সামাজিকভাবে নিরাপদ নয়, তখন সমাজের স্বাভাবিক পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। তাই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শুধু আইনগত ব্যবস্থা নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।