পাহাড়, ঝরনা কিংবা জুমক্ষেত–সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরই বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির চেনা চিত্র। রাঙামাটির ফুরোমোন পাহাড় কিংবা কাপ্তাইয়ের সীতাপাহাড়ের মতো নিরিবিলি পথগুলোতে বাড়ছে পর্যটকের ভিড়। জুমের পাশে জমছে প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট, স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবন হয়ে উঠছে ক্যামেরার বিষয়। এতে কিছু মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও অপরিকল্পিত পর্যটন ও কনটেন্ট তৈরির অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতায় বাড়ছে পরিবেশ ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, ঝরনা, জুমচাষ ও আদিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তৈরি হওয়া বিপুল ভ্রমণ ও লাইফস্টাইল কনটেন্টকে ঘিরে নতুন করে এ বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্থানীয়
বাসিন্দা, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দায়িত্বশীল উপস্থাপনার বদলে পাহাড়ি জীবনকে ‘ভাইরাল কনটেন্ট’ তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভাইরাল হলে বাড়ে পর্যটকের চাপ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক ভ্রমণ ভিডিও, রিলস ও ব্লগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব কনটেন্টে পাহাড়ি ঝরনা, জুমপাহাড়, আদিবাসী গ্রাম, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও জীবনযাপনকে আকর্ষণীয় পর্যটন অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনেক পোস্ট-এ পাহাড়কে ‘Hidden Gem’, ‘Authentic Experience’ কিংবা ‘Healing Therapy’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেও দর্শক আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে কোনো একটি স্থান ভাইরাল হওয়ার পর সেখানে হঠাৎ করে পর্যটকের চাপ বেড়ে যায়। এতে পরিবেশদূষণ, প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট ফেলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। ঝরনা ও পাহাড়ি ছড়া এখন মূলত ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণের জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
কাপ্তাইয়ের সীতাপাহাড়ের স্থানীয়দের অভিজ্ঞতাও এমন। সরেজমিনে সেখানে জুমিয়াদের চাষকৃত জুমের আশপাশে প্লাস্টিকের প্লেট, বোতল ও খাবারের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পর্যটকদের একটি অংশ ছবি ও ভিডিও তৈরির জন্য জুমের ভেতরেও প্রবেশ করছেন। এতে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সীতাপাহাড় এলাকার শজন মারমা বলেন, চলতি বছর ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার পর সেখানে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। শুক্র, শনিবারসহ সপ্তাহে পর্যটকের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়।
সীতাপাহাড়ের জুমচাষি ওয়াইমাহ মারমা (৫০) বলেন, ‘আমরা কাজ করলে পর্যটকরা তাকিয়ে থাকেন। এতে খুব অসুবিধা হয়। আমাদের পোশাকও সবসময় তো ভালো থাকে না। ছেঁড়াব্যাড়া
পোশাক পরে কাজ করতে হয়। এইভাবে আমাদের দেখলে বিব্রত হই। ওদের মানা করেছি আসতে এখানে। তাও আসেন।’
‘কনটেন্ট’ হয়ে উঠছে সংস্কৃতি
সমস্যাটি শুধু পরিবেশ বা জুমের ফসলের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ি সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মতে, জুমচাষ কেবল একটি কৃষিকাজ নয়; পার্বত্য অঞ্চলের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে এটি গভীরভাবে যুক্ত। অনেক ভ্রামণিক কনটেন্টে জুমক্ষেতকে কেবল ‘এস্থেটিক ব্যাকগ্রাউন্ড’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আদিবাসী গ্রামগুলোকেও অনেক সময় এমনভাবে দেখানো হয়, যেন সেগুলো পর্যটকদের দেখার জন্য সাজানো কোনো দর্শনীয় স্থান।
এ প্রবণতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমের আলোচনাতেও প্রশ্ন উঠেছে–পাহাড়ের মানুষের জীবন কি কেবল পর্যটনের উপকরণ? আলোচনায় পাহাড়ি সংস্কৃতি, জুম ও আদিবাসী জীবনকে ‘কনটেন্ট’ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। সেখানে জুমপাহাড়, ঝরনা ও আদিবাসী সংস্কৃতিকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ভাষায় উপস্থাপনের সমালোচনা করা হয়। এই বিতর্কের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিজুয়াল আর্টিস্ট তুফান চাকমা সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘Chittagong Hill Tracts নয়, এ যেন Content Hill Tracts’!’ তাঁর মতে, ‘সংস্কৃতি কোনো পর্যটন পণ্য নয়, আদিবাসীদের জীবন কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড সেট নয়।’ তিনি পাহাড়ে ভ্রমণের সময় স্থানীয় মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান। তাঁর এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
ওই পোস্টের মন্তব্যে একজন লেখেন, ‘এই জন্য অনেকাংশে আমরা নিজেরা দায়ী, নিজেদের জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে সস্তা পণ্যে পরিণত করার পেছনে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, পার্বত্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও সংস্কৃতিকে পণ্যে পরিণত করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এভাবে বাইরের পর্যটকদের সামনে আদিবাসী সংস্কৃতিকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার ফলে তাদের স্বতন্ত্র জীবনাচার, জীবনধারা, ঐতিহ্য ও পোশাক-আশাক হুমকির মুখে পড়ছে।
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থের মতে, পর্যটনের নামে পাহাড় দখল, বন ধ্বংস ও বাস্তুতন্ত্র বিনষ্ট করে সুবিধাবাদীরা মুনাফা লুটছে। ফলে স্থানীয় প্রকৃতি ও সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি, অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সম্মতি ছাড়া তথ্য বিকৃত করে পাহাড়কে ভুল ও বর্ণবাদীভাবে উপস্থাপন করছে, অথচ সেখানকার মূল সংকটগুলো তুলে ধরছে না। এ পরিস্থিতি সামলাতে গ্রামবাসী, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রথাগত কাঠামোর মাধ্যমে পর্যটকদের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং পর্যটক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নীতিমালা করা জরুরি।
পর্যটন থাক, ক্ষতি নয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। তাই পাহাড়ে পর্যটনের বিস্তার যে শুধু নেতিবাচক, তা বলছেন না স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় কারও আয় বেড়েছে, তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এতে স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সেই পর্যটন যদি ভাইরাল কনটেন্টের প্রতিযোগিতায় পরিবেশ, জুমচাষ ও মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী হয়ে উঠতে পারে।
সীতাপাহাড়ের চাইসিং মং মারমার কথাতেও সেই অবস্থান স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘ধান নষ্ট হলে কেউ আমাকে এক টাকা দেবে না। এখানে চাকমা হোক, বাঙালি হোক, মারমা হোক–যে কেউ আসুক আমাদের মানা নাই, আমাদের বাধা নাই। কারণ আপনারা আসেন ঘুরতে দেখতে। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি না হলেই হয়। আমরা এমনটাই চাই। আমাদের ক্ষতি না হলে আপনারাও সুখী, আমরাও সুখী।’
সীতাপাহাড়ের বোটচালক মোহাম্মদ নাসির বলেন, ‘পর্যটকদের যাতায়াত বাড়ার ফলে আমার আয় বেড়েছে। শুধু আমার না, এখানে গাড়িচালক, দোকানদার এবং ঘাটওয়ালাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।’
স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রনেশ চাকমা (২৮) বলেন, ‘পর্যটকদের যাত্রী হিসেবে পাওয়া কপালের ব্যাপার। বেশির ভাগ সময় লোকাল যাত্রীরাই উঠে থাকে। যখন পর্যটকদের পাওয়া যায়, তখন একদিনে ২০০০ টাকা আয় করা যায়।’
তবে পর্যটন বাড়লেও সবার ব্যবসা সমানভাবে বাড়েনি। হস্তশিল্প বিক্রেতা বাঁধন (২৩) বলেন, ‘আয় তুলনামূলক এখন অনেক কম। পর্যটকরা পণ্যগুলো কিনে কিন্তু তাতে আমাদের ব্যবসা মোটামুটি চলার মতো। শীতকালে যদিও পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে কিন্তু তবুও আহামরি খুব একটা লাভ হয় না, কারণ এখানে পর্যটন স্পটের সংখ্যা অনেক বেশি যে কারণে পর্যটকরা ভাগ হয়ে যান।’
ঝুলন্ত ব্রিজ এলাকার জয়া চাকমা বলেন, ‘এখানে পর্যটন স্পটের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে আমাদের তেমন বেচাকেনা হচ্ছে না। তবে শীতকালে কিছুটা ভালো চলে।’ একই এলাকার রাহুল চাকমা (৪৫) বলেন, ‘আমাদের এই দোকানগুলো তো ফুটপাতের। সেক্ষেত্রে পর্যটকরা আমাদের থেকে খুব অল্প দামে পণ্যগুলো নিয়ে যান। শহরের অন্যান্য স্থানে
সুন্দর সজ্জিত কাচের দেয়ালের দোকানগুলোতে পর্যটকরা বেশি কেনার জন্য যান। সেক্ষেত্রে আমাদের আয় কমই হয়।’
তাই পাহাড়ের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু পর্যটক কত বাড়ল, কিংবা কোন পাহাড় বা ঝরনা কতবার ভাইরাল হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো, পর্যটকের ক্যামেরায় যে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, সেই পাহাড়ে যারা বাস করেন, তাদের জীবনও কি সেই ছবির অংশ হিসেবে সম্মান পাচ্ছে? নাকি জুম, সংস্কৃতি, পোশাক আর মানুষের দৈনন্দিন জীবন শেষ পর্যন্ত কেবল আরেকটি ‘কনটেন্ট’ হয়ে উঠছে?
ফুরোমোনে রাতের ঘুমও হারাম
রাঙামাটির ফুরোমোন পাহাড় সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পর্যটকের চাপ বেড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। স্থানীয় দোকানি পুতুল চাকমা বলেন, ‘ফুরোমনে পর্যটকরা রাত ২টাম ৩টা থেকে ওঠা আরম্ভ করেন, ফুরোমনের পথ এখানে পাড়ার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। তারা যাওয়ার সময় চিৎকার, চেঁচামেচি, গান-বাজনা করে যান। তখন পাড়ার মানুষদের ঘুমের সমস্যা হয়।’
স্থানীয়দের দেওয়া হিসাবে, ফুরোমোন পাহাড়ের বিভিন্ন রিলস ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর গত দুই বছর ধরে সেখানে পর্যটকের ভিড়
বেড়েছে। পুতুল চাকমার ভাষ্য, নভেম্বর-ডিসেম্বর মৌসুমে ছুটির দিনে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি হয়; অন্য দিনেও শতাধিক পর্যটক থাকেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার দীপু বলেন, পর্যটক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও স্থানীয়দের মধ্যে সমন্বিত সচেতনতা তৈরির বিষয়গুলো নিয়ে পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে গবেষণা করা হচ্ছে। এ নিয়ে এক মাসব্যাপী সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পৃক্ত করে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রশাসনের এই কর্মকর্তা।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। রাঙামাটি জোনের ইনচার্জ তারিকুল আলম জুয়েল জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। পর্যটকদের সচেতন করতে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, নদী ভ্রমণসহ বিভিন্ন সতর্কতামূলক নির্দেশনা সংবলিত লিফলেট বিতরণ এবং লেকে স্পিডবোট নিয়ে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থাও রয়েছে।