Image description

‘আওয়াজ ডট বিডি’ নামের একটি ওয়েবসাইট চালুর মাত্র ১০ দিনে যৌন নিপীড়নের ১৭৩টি অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এর একটি বড় অংশ শৈশবে ঘটা এবং ৪৬ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে বাসাবাড়িতে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর সাইটটি চালু হয়। এতে পরিচয় গোপন রেখে নিজেদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা। সাইটটির নির্মাতারা জানান, কওমি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নিপীড়নের আলোচনা সচল রাখার উদ্দেশ্যে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি হলেও পরে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ সেখানে অভিজ্ঞতা জানাতে শুরু করেন।

ভুক্তভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছেলেদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়স ১০ থেকে ১২ বছর এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ৭ থেকে ৯ বছর। ভুক্তভোগী প্রতি ১৩ জন ছেলের মধ্যে একজন এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রতি সাতজনে একজন নিকটাত্মীয়ের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে একবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৩ শতাংশ, একাধিকবার ৫০ শতাংশ এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬ শতাংশ।

‘আলাপটা যেন সচল থাকে’

আওয়াজ ডট বিডি তৈরি করেছেন কওমি মাদ্রাসায় পড়া দুই তরুণ সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ও রাকিবুল হাসান। সালাহউদ্দীন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং রাকিবুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন।

ওয়েবসাইট তৈরির কারণ জানতে চাইলে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর স্ট্রিমকে বলেন, ‘মাদ্রাসায় ছেলেশিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো চেপে যাওয়ার একটি প্রবণতা আছে। আমরা চেয়েছি এই নীরবতা ভাঙুক এবং মানুষ যেন অভিজ্ঞতা বলতে পারে। এতে অভিভাবকরা সতর্ক হবেন। কারণ শুধু মাদ্রাসায় নয়, আত্মীয়দের কাছেও অনেকে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।’

রাকিবুল হাসান বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসায় বলাৎকারের বিষয়টি কিছুদিন আলোচনা হওয়ার পর আবার হারিয়ে যায়। এই আলোচনাটা যেন সবসময় সচল থাকে, সেই লক্ষ্যেই সাইটটি তৈরি করা।’

ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন

সাইটে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটা ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৮ শতাংশ কওমি মাদ্রাসার। এছাড়া মসজিদে ১৬ শতাংশ, স্কুলে ১৪, বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০, আলিয়া মাদ্রাসায় ৫, কলেজে ৫ ও মন্দিরে ২ শতাংশ ঘটনার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ভুক্তভোগী এক সাবেক শিক্ষার্থীর তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় জানা যায়, স্থানীয় কওমি মাদ্রাসায় রাতে ডেকে নিয়ে তাদের ওপর জোরপূর্বক বলাৎকার চালানো হতো। পবিত্র গ্রন্থ ছুঁইয়ে শপথ করানোর ভয়ে ভুক্তভোগীদের কেউই এসব ঘটনা প্রকাশ করতে পারতেন না।

 

সবচেয়ে বেশি ঘটনা বাসাবাড়িতে

সাইটের তথ্যানুযায়ী, মোট নিপীড়নের ৪৬ শতাংশ ঘটেছে বাসাবাড়িতে। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ অভিযোগকারীর নিজের বাসায় এবং ২৩ শতাংশ অভিযুক্তের বাসায়। পরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৩৯ শতাংশ ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে এ হার ৪২ শতাংশ।

 

সব তথ্য আসছে না

নির্মাতারা জানান, এখনও সাইটটি অনেকের কাছে পৌঁছায়নি। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ও রাকিবুল হাসান বলেন, দেশে যে পরিমাণ ঘটনা ঘটে, তার খুব সামান্য তথ্যই এখানে এসেছে। সচেতনতা বাড়লে আরও অভিযোগ জমা পড়বে।

শিশু অধিকার সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৩৩৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির (বিপিও) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ৪১৫টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে অন্তত ২৫টি ঘটেছে বিভিন্ন মাদ্রাসায়। স্ট্রিম নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখেছে, চলতি বছর অন্তত ৩৭ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ২৯ জনই ছেলেশিশু এবং এর বড় অংশই শিক্ষকের দ্বারা নিগৃহীত।

 

প্রয়োজন জোরদার ব্যবস্থা

‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার স্ট্রিমকে বলেন, ‘অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে এবং শিশুকে “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” শেখাতে হবে। বর্তমানে শিশু নিপীড়ন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন।’