কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের তৎপরতা বন্ধে মাঠ পর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশের উচ্চ পর্যায় থেকে এই নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও শুরু হয়েছে। আগাম তথ্যের ঘাটতি ও পুলিশি দুর্বলতার কারণে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বিভিন্ন তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছেন। সরাসরি ও অনলাইনে গোপন বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। আগাম তথ্য না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না পুলিশ।
বেশ কিছুদিন ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি হাইকমান্ডের নির্দেশে ঝটিকা মিছিল করছেন নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে ঢাকার মতো জায়গায় একাধিক খণ্ড খণ্ড মিছিল তারা ইতিমধ্যে করেছে। ঢাকার বাহিরেও বেশ কিছু মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। তবে গুলশানের বড় মিছিল ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো চাপে রয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। পরে মাঠ পর্যায়ে দেয়া হয়েছে নানা নির্দেশনা। গত রোববার পুলিশ সদর দপ্তরের পাশাপাশি ডিএমপি’র সদর দপ্তরেও বিশেষ বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে পুলিশের সবক’টি ইউনিট প্রধানকে কড়া বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কোনো মিছিল ঠেকাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ তার ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নেয়া হবে। যে এলাকায় মিছিল হবে ওই এলাকার পুলিশকে দায় নিতে হবে। তাই প্রতিটি থানায় রাত এবং দিনে টহল বাড়াতে হবে। মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিরা সমন্বয় করে বৈঠক করে অপরাধীদের ধরার পাশাপাশি সার্বিক বিষয়ে নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। এতে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিক অন্যত্র বদলিরও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গুলশানের মিছিলের জেরে ৫ দিন পর গুলশান থানার ওসি ও গুলশান জোনের ডিসিকে ক্লোজ করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা এক অফিস আদেশে গতকাল গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদকে পরবর্তী সিনিয়র কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে ডিএমপি সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক কারণে ঢাকা মেট্রোপলিটন সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো। এর আগে, একইদিন গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। ওসির প্রত্যাহার আদেশে বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে ১৬ই সেপ্টেম্বর ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে দাউদ হোসেনকে সংযুক্ত (ক্লোজ) করা হলো।
এর আগে গত শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলশান থানাধীন ৩ নম্বর সড়কের কেএফসি-সংলগ্ন সড়কে মিছিল করে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিলকারীরা পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় হাতেনাতে দু’জনকে গ্রেপ্তার ও পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে শুক্রবার পুলিশ হয়তো আন্দাজ করতে পারেনি যে ওই সময় ওই এলাকায় জুমার নামাজ পড়তে এসে তারা এরকম একটা কিছু করতে পারে। গুলশানে মিছিলের বিষয়ে তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে জুমার নামাজ আদায়ের কথা বলে সেখানে কিছু লোক জড়ো হয়েছিল। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এর আগে গাজীপুর মহানগরের পূবাইল থানাধীন টেকপাড়া, সোবানী রিসোর্টের পেছনের রাস্তায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ২৫-৩০ জন সমর্থক মিছিল করে। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকায় সাবেক যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে পৃথক দু’টি ঝটিকা মিছিল হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই মাঠপর্যায়ে দলটির তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব ঘটনার পর সারা দেশের থানার ওসিদের সতর্ক করা হয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যাপক অপতৎপরতা চালাচ্ছে। দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে দলটি ষড়যন্ত্রের ছক আঁকছে। এতে পুলিশের গাফিলতিও আছে। পুলিশের টহলে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। আছে গোয়েন্দা ব্যর্থতাও। এই সুযোগে আওয়ামী লীগ সারা দেশে ঝটিকা মিছিল করার সাহস পাচ্ছে। সরকারের হাই কমান্ডের চাপে ডিএমপি’র বৈঠকে কমিশনার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ অরাজকতা করার চেষ্টা করলেই কঠোর অ্যাকশনে যেতে হবে। কোনো ধরনের কার্যক্রম চালানো বা ঝটিকা মিছিল হলে তার দায়দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট জোনের ঊর্ধ্বতনদের।
পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের পুলিশের সমন্বয়ের তাগিদ দেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতনদের জবাবদিহির আওতায়ও আনতে বলা হয়। কোনো এলাকায় মিছিল হলে শুধু অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ আগে থেকে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেটিও মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। শুধু ঢাকায় কঠোরতা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও একই ধরনের নজরদারি বাড়াতে বলা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশানুযায়ী কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যাতে মিছিল করতে না পারে, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে বৈঠক হচ্ছে। মিছিল করার চেষ্টা করলেই অ্যাকশনে যাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া রাত থেকেই বাসাবাড়ি ও মেস, হোস্টেল ও আবাসিক হোটেলে একযোগে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দাদের। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন (আইএডি) গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মিছিলের স্থানসহ নেতৃত্ব দেয়া নেতাকর্মীদের একটা তালিকা করা হয়েছে।
এদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উসকানি ও ষড়যন্ত্র ঠেকাতে এবার প্রিভেন্টিভ মেজার বা আগাম প্রতিরোধমূলক কৌশল নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অপরাধ সংঘটনের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর সনাতন ধারা বদলে সিটিটিসি, ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে কঠোর ব্লক চেক, স্পটভিত্তিক জিরো-গ্যাপ সিকিউরিটি এবং আবাসিক হোটেলের অতিথি তালিকা সংরক্ষণের মাধ্যমে বহিরাগতদের মুভমেন্ট ও সম্ভাব্য অপতৎপরতা রোধে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। এছাড়া আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন হোটেলের অতিথিদের তালিকা নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। হোটেলগুলো থেকে অতিথিদের তথ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় যেন এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপরাধীরা যাতে ঢাকায় এসে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সেজন্য রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।