মুহুরী নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরের জমির ভারত-বাংলাদেশের দখল ও মালিকানার দ্বন্দ্বের ৭৯ বছরেও মীমাংসা হয়নি। কাগজে-কলমে জমির মালিক বাংলাদেশিরা হলেও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা। দুদেশের জরিপ দল মাঠে নেমেছিল। সীমারেখা নির্ধারণে বসানো হয়েছে ৪৪টি অস্থায়ী কাঠের খুঁটি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বৈঠকও হয়েছে একাধিকবার। তারপরও শেষ হয়নি মুহুরীর চরের সীমান্ত বিরোধ।
জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত ভাগের সময় থেকে ফেনীর পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্তে মুহুরী নদী এলাকার প্রায় দুই কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলছে সমাধানের চেষ্টা। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তি, ২০১১ সালের প্রটোকল, ২০১০-১১ সালের যৌথ জরিপ এবং ২০১৩-১৪ মৌসুমে দুদেশের যৌথ মাঠ জরিপের মাধ্যমে ওই এলাকায় ৪৪টি কাঠের খুঁটি স্থাপন করে সীমারেখা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু স্থায়ী পিলার নির্মাণের জন্য দুদেশের সরকারের সম্মতি মেলেনি।
সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তের ৮৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে পরশুরামের মুহুরী নদী এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ অমীমাংসিত ছিল। জানা গেছে, বিভিন্ন সরকারি নথিতে মুহুরীর চরের আয়তন ৯২.১৪ একর বলা হয়েছে। ২০১১ সালের প্রটোকল-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ৯২.১৪ একরের মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ৭১.৯৪ একর এবং ভারতের অংশ ২০.২০ একর। ২০১৪ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি দুদেশের জরিপ বিভাগ সেখানে যৌথ জরিপও চালায়। কিন্তু স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি ৯২.১৪ একরের মধ্যে প্রায় ৩১.১৮ একর বাংলাদেশের দখলে, ৮ একর ভারতের দখলে এবং বাকি ৫২.৯৬ একর ভূমি অমীমাংসিত।
মুহুরীর চর কোনো পরিকল্পিত ভূখণ্ড নয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন ও পলি জমার মধ্য দিয়ে এর বর্তমান ভূপ্রকৃতি তৈরি হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর সীমান্ত নির্ধারণে মুহুরী নদীর মধ্যস্রোতকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। সমস্যা তৈরি হয় নদী যখন তার গতিপথ বদলাতে শুরু করে। ১৯৪৭-এর রেডক্লিফ লাইনে মুহুরী নদীর মধ্যস্রোতকে সীমান্ত ধরা হয়েছিল। তবে আশির দশকে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পশ্চিমে সরে গেলে পুরোনো নদী শুকিয়ে নতুন চরের সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক আইন এবং নদীর মধ্যস্রোতের মারপ্যাঁচে দুদেশের ভূখণ্ড নির্ধারণে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সীমান্ত সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল স্থলসীমান্ত চুক্তি। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি দীর্ঘ চার দশক পর ভারতে ২০১৫ সালে স্থলসীমান্ত বিল হিসেবে পাস হলেও মুহুরী চরের ক্ষেত্রে পাকা পিলার বসানোর বিষয়টি আর এগোয়নি। ২০২০ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থায়ী পিলারের জোরালো প্রস্তাব করা সত্ত্বেও ওপার থেকে মেলেনি কোনো সবুজ সংকেত। ফলে চুক্তির পরও মুহুরীর চর পুরোপুরি বিরোধমুক্ত হয়নি। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময়ের প্রতিবেদনে ৯২.১৪ একরের মধ্যে বাংলাদেশকে ৭১.৯৪ একর এবং ভারতকে ২০.২০ একর দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সময় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অমীমাংসিত এলাকাগুলো জরিপের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ জরিপ মৌসুমে মুহুরী নদী এলাকার যৌথ জরিপ করে একটি ইনডেক্স ম্যাপ তৈরি এবং উভয় দেশের কারিগরি পর্যায়ে তা স্বাক্ষরিত হয়। ২০১১ সালের মধ্যেই সমস্যাটি সমাধানের দিকে যাওয়ার একটি প্রশাসনিক পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা মাঠপর্যায়ে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি।
২০১৪ সালে সীমা নির্ধারণে বসানো হয় ৪৪ খুঁটি। ২০১৪ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারতের জরিপ বিভাগ বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় মুহুরীর চরে যৌথ জরিপ পরিচালনা করে।
সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ মৌসুমে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ অনুরোধে অমীমাংসিত মুহুরী চর এলাকায় মাঠ জরিপ চালিয়ে মোট ৪৪টি কাঠের খুঁটি স্থাপন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। দুদেশের সরকারের সম্মতি পেলে ওই জায়গায় পাকা পিলার নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। তবে অস্থায়ী পিলারের জায়গায় স্থায়ী পিলার নির্মাণের বিষয়টি আর এগোয়নি। সরকারি নথি বলছে, ৪৪টি কাঠের খুঁটি বসিয়ে সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু কাঠ বা বাঁশের খুঁটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত চিহ্ন নয়। সীমান্তে বসানো কাঠের খুঁটিগুলো অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। খুঁটিগুলোতে লাগানো জরিপ নম্বর লেখা লোহার পাতও মরিচা ধরে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলে স্থায়ী কংক্রিট পিলার না থাকলে সীমারেখার দৃশ্যমানতা ও মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
উত্তর কাউতলী গ্রামের ফকির নুর মোস্তফাদের পরিবারের প্রায় ১০ একর জমি রয়েছে মুহুরীর চরে। বিএসএফের বাধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এসব জমিতে যেতে পারছেন না তারা। নুর মোস্তফা বলেন, আমাদের ভাইদের বেশিরভাগ জমি মুহুরীর চরের মধ্যে। ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারছি না।
স্থানীয় বাসিন্দা দাউদুল ইসলাম ফকির বলেন, সিএস ও বিএস খতিয়ান থাকা সত্ত্বেও আমরা জমির মালিক হয়েও জমিতে যেতে পারছি না। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে সেখানে দখলে যেতে পারছি না।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী জরিপ কর্মকর্তা পারভেজ মিয়া জানান, বিরোধপূর্ণ মুহুরীর চরের সীমানা বিরোধ নিরসনে ২০১৬ সালে দুই দেশের জেপিডব্লিউডি’র যৌথ উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে সীমানা নির্ধারণ, জরিপ ও সীমান্ত চিহ্ন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এ সময় উভয় দেশের সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জরিপের প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফেনী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এমএম জিল্লুর রহমান বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জমি ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা
১৭ সেপ্টেম্বর ফেনীর পরশুরামে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন মুহুরীর চরের জমি হারানো বাংলাদেশি কৃষকরা। সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধপূর্ণ মুহুরীর চরের জমির মালিকানা ও দখল সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তারা।
স্থানীয়দের দাবি, বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি পরশুরাম-সুবার বাজার সড়কে মুহুরী সেতু নির্মাণ এবং মুহুরীর চরের বাংলাদেশি কৃষকদের জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে। মির্জানগর ইউনিয়নের নিজ কালিকাপুর, উত্তর কাউতলী ও ফকিরের খিল গ্রামের শতাধিক কৃষকের বহু জমি রয়েছে মুহুরীর চরে। কৃষকদের অভিযোগ, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বাধার কারণে বছরের পর বছর তারা নিজেদের জমিতে যেতে ও চাষাবাদ করতে পারছেন না। নিজ কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আলমগীর মজুমদার বলেন, মুহুরীর চরে শতাধিক বাংলাদেশি কৃষকের জমি রয়েছে। একসময় সেখানে অনেকের ভিটেমাটিও ছিল। এখন সেগুলো ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে চরের জমি নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি কৃষকদের জমিগুলো উদ্ধার করে চাষাবাদের আওতায় আনা গেলে তারা নতুন করে জীবন ফিরে পাবেন। তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে। প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টির সমাধান করলে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।