প্রিয় তারেক রহমান
আশা করি আপনি খারাপ আছেন। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে কোনো প্রধানমন্ত্রী ভালো আছেন - এটা প্রায় অশ্লীল একটা আয়োজন। বহু বছর আগে লন্ডনে আমি আপনাকে বলেছিলাম যে this position will crush your soul. এখনো তাই মনে করি। এই দেশে জনপ্রিয়তার ভার খুব বেশি ও অসহনীয়। এই যাত্রায় আপনার কোনো নিস্তার নাই; নাই কোনো retrieve।
আপনাকে দেখলেই আপনার মার কথা মনে হয়। এক গভীর মমতা আমাকে ছেয়ে ফেলে। আপনারা দুজনেই এক দুঃখী জীবন পার করেছেন। তাই এরকম পাবলিকলি বিব্রত করার ইচ্ছা আমার হয় না। কিন্তু একটা দৃশ্যকল্প আমার মাথায় আসে। দৃশ্যকল্পটা এরকম:
কেয়ামতের দিন বাংলাদেশের এক মানুষ রসুল পাককে বলছেন: য়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাবা-মা আপনার আদেশ মেনে আমাকে কোরান মুখস্থ করতে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিল। সেখানে আমাকে নিয়মিত ধর্ষণ করা হতো। কোনো ফেরেশতা কিংবা আপনার কোনো উম্মত আমাকে বাঁচাতে আসে নাই। আমি তাই আর মুসলমান থাকি নাই।
তিন চার দিন ধরে ভাবছি কী এর জবাব হতে পারে? কী বলবেন তিনি?
মনে হলো যে আপনাকে বিব্রত করাই আমার কর্তব্য। এই ট্যাবু নিয়ে কেউ কথা বলে না কিন্তু যদি একটা শিশুকেও এই দোযখ থেকে রক্ষা করা যায় - আমাকে চেষ্টা করতে হবে।
Defender of faith আপনি নন, তা আমি কল্পনাও করি না। কিন্তু অতি অবশ্যই আপনি ও আমি উভয়েই defender of our children। এটাই আমাদের রোল। আমার কোনো ক্ষমতা নাই; আপনার আছে। কিন্তু আমাদের উভয়েরই এই নিরীখে একই দায়িত্ব; আমাদের প্রথম পরিচয়: আমরা বাবা। বহু ছেলে আমাকে যোগাযোগ করেছে যে তারা ছোটবেলায় নিয়মিত ধর্ষিত হয়েছে মাদ্রাসায় এডাল্টদের দ্বারা। এসব লেখা, পড়া না যায়। ফেইসবুকে কিছুদিন আগে বহু মাদ্রাসা ছাত্র আমার একটা লেখায় তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছে। অবস্থা এতোটা ভয়াবহ যে আপনাকে এবং আপনার সরকারকে পাবলিকলি বিব্রত করাই যথার্থ বলে মনে করছি।
বাংলাদেশে সমকামিতা আমাদের কল্পনার চাইতে অনেক বেশি প্রচলিত। এ নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নাই। কোনো এডাল্ট যদি স্বেচ্ছায় সমকামী হয় - এর বিচার খোদাতালা করবেন। আমি মনে করি না যে এটা জাজ করা আমার দায়িত্ব। আধুনিক রাষ্ট্র এমনই এক দৈত্য যে তাকে যদি বিচারের দায়িত্ব দেন - সে নির্ঘাত সর্বনাশ করবে ও অবিচার করা শুরু করবে। সমকামিতা বা বহুকামিতা বা উভকামিতাকে ক্রিমিনালাইজ করা সরকারের দায়িত্ব না এবং সে অনুরোধও আমি করছি না। কিন্তু শিশু ধর্ষণ একটা সম্পূর্ণ আলাদা ক্যাটাগরি এবং আপনাকে এটা বন্ধ করতে হবে। অন্তত চেষ্টা করতে হবে।
মুসলমান হিসাবে আমার জন্য এটা স্বীকার করাটা অপমানকর যে বাংলাদেশের বহু হাবিয়া মাদ্রাসায় যা হয় ও হচ্ছে - তার সাথে দোজখেরও তুলনা করা যায় না। শুধু পেনিট্রেটিভ সেক্স না, আমাকে যারা লিখেছেন তাদের একটা মূল অভিযোগ - এখানে তাদের পশুর মতো পেটানো হতো। বহু আগে আমি একটা সিনেমা দেখেছিলাম: Sleepers. নীয়র্কের চারজন কিশোর দুর্ঘটনায় একজন পথচারীকে মেরে ফেলে এবং এরপর তারা জেলে যায়। সেখানে ওদের নিয়মিত ধর্ষণ করা হতো ও পেটানো হতো। বহু বছর পর ওরা জেল থেকে বেরিয়ে প্রতিশোধ হিসাবে জেলারকে গুলি করে হত্যা করে। আমার মনে হয়েছিল যে তারা ঠিক কাজ করেছে। আইন যা বলে বলুক - সেটা আইনের কাজ। কিন্তু মানুষ হিসাবে যে শিশু ধর্ষিত হয়েছিল, বড় হয়ে তার ধর্ষককে হত্যা করা আমি মনে করি মানবধর্মের বাইরের কিছু না। এ আমার ব্যক্তিগত মত - কারো আমার সাথে একমত হওয়ার প্রয়োজন নাই।
অবশ্যই আপনি মনে রাখবেন যে বাংলাদেশের মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ কোনো ব্যতিক্রমী বা কালেভদ্রে ঘটে এমন ঘটনা না। বহু মাদ্রাসা ছাত্রের মতে - এটা একটা মহামারী এবং অনেকে এও মনে করে যে অবস্থা এতোটাই খারাপ যে মীনিংফুল কোনো চেইঞ্জ আনাই সম্ভব না।
আমার অনুরোধ: আপনারা নিয়ম করুন যে কোনো হাফিজিয়া মাদ্রাসা আবাসিক হতে পারবে না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি ছাত্রদের জন্য লকড রুম না দিতে পারে - তারা আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে পারবে না। প্রতিটি মাদ্রাসা, সিসিটিভির আওতায় আনতে হবে। কোনো মাদ্রাসায় যদি কোনো শিক্ষক সেকচুয়াল এডভান্স করে এবং জানার পরেও প্রিন্সিপাল যদি সেই ঘটনা লুকিয়ে ফেলে ও পুলিসকে না জানায় - সেই প্রিন্সিপালের অন্তত দুই বছরের জেল দিন। সরকারকে অবশ্যই ব্যাঙের ছাতার মতো অনিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা চালু করতে দেওয়া যাবে না।
আমি চিন্তা করতে পারি না যে দ্বীন বোঝার বিদ্যাপীঠে এমন ঘটনা ঘটবে। আমাদের কালে এই পার্ভার্ট হুজুররা ইসলামকে হাইজ্যাক করছে আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি। হাবিয়া মাদ্রাসার ঐ পারভার্ট হুজুর - যারা ৭ বছরের ছেলেকে ধর্ষণ করে - কোনো এক জাদুবলে তারা ইসলামকে রেপ্রেজেন্ট করে কিন্তু আমরা করি না।
এ ধরনের ম্যাসিভ পরিবর্তন, যা আসলে মানব চরিত্রের ভয়াবহ নীচতাকে এড্রেস করে ও যার কার্যকারিতা কখনোই টাকাপয়সা দিয়ে মাপা যাবে না - এমন আইন কোনোদিনও আপনি পার্লামেন্টে পরামর্শ করে ইমপ্লিমেন্ট করতে পারবেন না। আপনারই নিজের দলের লোকজন এমন ভয় দেখাবে যেন এই কাজ করলে আপনার দ্বীন-দুনিয়া-পার্লামেন্ট সব শেষ হয়ে যাবে। আমার পরামর্শ যে আপনার পছন্দ অনুযায়ী ৩/৪ জন ওয়াইজ ম্যানের পরামর্শ নিন এবং ক্যাপ্টেনস কলের মতো এই আইন এককভাবে ইমপ্লিমেন্ট করুন।
এই আইন চাপিয়ে দিতে হবে। য়েস! এ ধরনের ট্যাবু টপিকে পার্ফর্মেটিভ পার্লামেন্ট বিতর্ক আদতে কোনো কাজ করবে না, সমাজকে আরো বিভক্ত করবে।
ভুলেও এ নিয়ে আপনার উল্টা দিকের ভদ্রলোকদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। কোনো লাভ নাই। বাংলাদেশের ইসলামিস্টদের মূল চাহিদা কেবলমাত্র তিনটি: বিএনপি, ইন্ডিয়ার সাথে শত্রুতা বজায় রাখবে (যদিও তারা ক্ষমতায় আসলে ইন্ডিয়ার সাথে তাদের সম্পর্ক আওয়ামী লীগের চাইতেও বেশি ভালো হবে আমার অনুমান); তাদের জন্য প্রচুর সরকারি চাকরি সৃষ্টি করতে হবে ও যাদেরকে তারা সেকুলার মনে করে - ইসলাম বিষয়ে তারা কোনো প্রয়োজনীয় কথা বলবে না। অর্থাৎ তাদের সম্রাজ্যে আপনি ও আপনারা হাত দিবেন না। মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপনারা যদি কোনো সাধারণ উপায়ে আলোচনা করে আইন করতে চান - অবস্থা এমনই জটিল হবে যে "ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি" অবস্থার উদ্ভব হবে। হয়তো আমার দুশ্চিন্তা মাত্রাতিরিক্ত - কিন্তু আমি সত্যিই গর্বিত হবো যদি আমার দুশ্চিন্তা ভুল প্রমাণিত হয়। তাদের নিয়ে অভিজ্ঞতা আমার মাত্রাতিরিক্ত তিক্ত বলেই এই দুশ্চিন্তা।
ইসলামিস্টদের চোখে কালচারাল ন্যারেটিভ, ইন্ডিয়া, এমেরিকা, সেকুলার - সব এঙ্গেল ধরা পড়বে। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ধরা পড়বে - শুধু ধর্ষিত শিশুটার এঙ্গেল ধরা পড়বে না। কোনোদিনও শুনেছেন যে পার্লামেন্টে তারা শিশু ধর্ষণ নিয়ে কথা বলছে ? (আমি একটি শিশু ধর্ষণের কথা বলছি না - মহামারীর কথা বলছি)
অবশ্য এই দোষে আমি নিজেও কমবেশি দোষী। ৫ই অগাস্টের পর বিএনপি কর্মীদের চাঁদাবাজি নিয়ে আমিও যথেষ্ট কথা বলি নাই। আমাদের সাইডের যে চার গোষ্ঠী (বিএনপি, জামাত, এনসিপি ও ইন্টেরিম) - কারো বিষয়েই আমি তেমন সমালোচনা করি নাই। এর কারণ খুবই সঙ্গত এবং অন্যেরা কেন আমার চোখে দুনিয়া দেখে না - এটাই বরং আমার প্রশ্ন। আমি মনে করি না যে এই সময়টা সমালোচনায় ক্ষত-বিক্ষত করার। আমি মনে করেছি যে যেভাবেই হোক - আমরা যদি ১০ বছর ঠেলেঠুলে গণতন্ত্রের গাড়িটা সামনে নিয়ে যেতে পারি - আমরা আওয়ামী জাহেলিয়া নিশ্চিতভাবে অতিক্রম করবো। আপনার কিংবা বিএনপির প্রচুর ভুলভ্রান্তি ও অপরাধ হবে ও হচ্ছে। কিন্তু ইন্টেরিম কিংবা বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত সঠিক দিকেই দেশকে স্টিয়ার করছে বলে আমার ধারণা। যদিও দুর্নীতি হচ্ছে - আমি অন্তত এ ব্যাপারে কনভিন্সড যে এখন পর্যন্ত আপনাদের লক্ষ্য ডাকাতি কিংবা আয়নাঘর না।
কিন্তু শিশু ধর্ষণ একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্যাটাগরি এবং এ নিয়ে আমাদেরকেই আইন করতে হবে। এবং আমাদেরকেই কথা বলতে হবে। কারণ শিশুরা ধর্ষণের কনসেপ্টটা বোঝে না এবং না বোঝাটাই আইডিয়াল।
রাজনৈতিকভাবে; আপনার জন্য মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ আত্মঘাতী হবে। আমরা যারা শার্ট প্যান্ট পরি ও দাড়ি রাখি না - অবশ্যই তারা ইসলাম বিষয়ে কিছুই জানে না এবং ইসলাম নিয়ে তাদের যেকোনো পদক্ষেপ ইসলামিস্টদের কাছে ধর্মের উপর আঘাত বলেই বিবেচিত হবে। কোনো সন্দেহ নাই যে আপনার জন্য রাজনৈতিকভাবে মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ আইন ব্যাক ফায়ার করবে। রাজনৈতিক লাভ হবে যদি তাদেরকে ইচ্ছামতন চলতে দেওয়া হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে সেই শিশুগুলো উপেক্ষিত হবে। তাছাড়া অত্যন্ত পিকিউলিয়ার কারণে মাদ্রাসা আসলে বাংলাদেশের স্টেটাস কোর জন্য সহায়ক। মাদ্রাসার ছেলেরা অত্যন্ত অল্পতে সন্তুষ্ট। সরকার তাদের পেছনে খুবই কম ব্যয় করে - অথচ তারা অন্যদের তুলনায় ডিসিপ্লিনড। এই যে বাই এন্ড লার্জ - একটা ডোসাইল জনগোষ্ঠী আমরা তৈরী করছি যারা সাথে-পাছে নাই - আবার সৌদিআরবে গিয়ে রেমিট্যান্স পাঠায় - ম্যাক্রো লেভেলে খুবই চমৎকার একটা বন্দোবস্ত। আসলে তো এরাই আমাদের খনিজ তেল। মধ্যপ্রাচ্যে তেল উঠাতে তাও বিনিয়োগ করতে হয়। আমাদের খনিজ থেকে সরকারকে কোনো ইনভেস্ট করতে হয় না।
আমি আশা করি যে একদিন আমাদের মাদ্রাসার ছেলেরা মেইনস্ট্রীমড হবে। একদিন মাদ্রাসার ছেলে মিলিট্রি জেনরেল হবে, সিইও হবে, সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের মতো মানুষ হবে। সেটা কখনোই সম্ভব হবে না যদি তারা ছোটবেলা থেকে ডিফেন্সিভ হওয়ার ট্রেনিং পায়, সারাক্ষণ যদি সন্দেহ আর ঘৃণা করার শিক্ষা পায়। আমাদের সমাজ গভীরভাবে ডিস্ক্রিমিনেটরি এবং আমরা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাথে গভীরতর অন্যায় করে যাচ্ছি দশকের পর দশক ধরে। তার ওপর আমাদের সমাজ ছেলে শিশুদের ব্যাপারে অকল্পনীয় পর্যায়ের উদাসীন। এই অবিচার বন্ধ করার একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে আমাদের সন্তানদের সেলফ রেস্পেক্ট শিখতে হবে, তাদেরকে য়ুজফুল হতে হবে, তাদেরকে কম্পিটেন্ট হতে হবে। আমাদের বিদ্যমান মাদ্রাসা ব্যবস্থা এক ভয়াবহ নেগেটিভ মেন্টালিটি নার্চার করে। 'অপর'কে তারা শত্রু বলে বিবেচনা করে। এর একটা বড় কারণ হলো ছেলেবেলায় এই রাষ্ট্র, এই সমাজ তাদের কেয়ার নেয় না। আমার মন ভেঙে যায় যখন দেখি গণরুমে শিশুরা পশুর মতো শুয়ে আছে। কীভাবে এই শিশু বড় হয়ে নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে কল্পনা করবে?
প্রশ্ন হলো: আপনি কি শক্ত হাতে শিশু ধর্ষণ বন্ধ করবেন না পলিটিকাল কারেক্টনেসকে প্রাধান্য দেবেন?
এরকম কঠিন প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর হয় না। তা আমি আশাও করি না। কিন্তু সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে। ডু ওয়াট ইজ রাইট। আপনাকে প্ররোচিত করার জন্য একটা ছবি জুড়ে দিলাম। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলোর একটা। এই মুহূর্ত কী ও কেমন - কেবল একজন বাবা বুঝতে পারবে। আপনার ও আমার জীবনে মিল কেবলমাত্র একটি: আমরা উভয়ই কন্যা সন্তানের পিতা। ডাউন ডীপ ইনসাইড - আমরা উভয়ই জানি যে - ইফ পুশ কামস টু শোভ - আমরা উভয়ই এই একটি প্রাণ রক্ষা করতে জেনেবুঝে নিজেরটা দিতে পারি। এই ছবির মর্ম আপনি বুঝতে পারবেন।
আপনাকে এই দেশের অগণিত শিশুর সম্মান ও জীবন বাঁচাতে পারতে হবে। পারতেই হবে।