ছাদে উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ কিনে নেওয়ার সরকারি ঘোষণা উদ্যোক্তাদের জন্য লাভজনক হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।
সরকার জানিয়েছে, ছাদে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের জন্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনা হবে।
ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সোলার প্যানেলের সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা যুক্ত করলে প্রাথমিক ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে সরকারের নির্ধারিত মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মূল বিনিয়োগের টাকা উঠিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।
বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলের ইনভার্টারের দাম পড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ব্যাটারির পেছনে খরচ হয় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। প্যানেল কেনা, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচ মিলিয়ে এই ব্যবস্থার মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ছয় কিলোওয়াটের একটি সোলার সিস্টেম বসাতে খরচ পড়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা। এমন একটি সিস্টেম থেকে দিনে গড়ে প্রায় ২৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।
কোনো পরিবারের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার গড়ে সাড়ে চার কিলোওয়াট-ঘণ্টা হলে অবশিষ্ট ২৩ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ গ্রিডে পাঠানো সম্ভব, যা মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৬৯০ ইউনিট। সরকারের ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে মাসে এখান থেকে সর্বোচ্চ আয় হতে পারে ৭ হাজার ২৪৫ টাকা। ছয় লাখ টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগের বিপরীতে এই মাসিক আয় অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া শীতকালের চার মাস সূর্যের আলো কম থাকায় এবং বিদ্যুতের চাহিদা সীমিত থাকায় নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।
বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন প্রণোদনার লক্ষ্য মূলত মানুষকে সোলারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। তবে ব্যাটারিসহ সিস্টেমের ক্ষেত্রে সরকারের খরচের হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’
তিনি জানান, লোডশেডিংয়ের সময় সরবরাহ চালু রাখতে ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে সিস্টেমে ব্যাটারি বাধ্যতামূলক কি না তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বড় ছাদ থাকলে ব্যাটারি ছাড়া সোলার বসিয়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে লাভ হতে পারে। তবে ব্যাটারি যুক্ত হলে সেই হিসাব আর খাটে না।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি আর্থিক বিশ্লেষণ সংস্থা আইইইএফএ-এর বাংলাদেশ অংশের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘যখন মানুষ বাসায় না থাকে, তখন গ্রিডে সোলার থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করে হয়ত তারা কিছু অংশে লাভবানও হতে পারবেন। কিন্তু ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমসহ সোলার প্যানেল লাগানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, ট্যারিফও আসলে ১০ টাকা ৫০ পয়সার বেশি পড়ে যাবে। ফলে প্রণোদনা হিসেবে ঘোষণা করলেও, মানুষ এতে কতটুকু উৎসাহিত হবেন সে বিষয়ে সংশয় আছে।’
তা ছাড়া, সোলার প্যানেল ২০ থেকে ৩০ বছর স্থায়ী হলেও ইনভার্টার ও ব্যাটারির আয়ুষ্কাল কম। সাধারণত প্রতি দশ বছর পর ইনভার্টার এবং কয়েক বছর পরপরই ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হয়। ফলে পুরো প্রকল্প মেয়াদে প্রকৃত পরিচালনা ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়।
তবে সৌর বিদ্যুৎ সরঞ্জাম বিক্রির সঙ্গে জড়িত এক ব্যবসায়ী খরচের বিষয়টি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে বলেন, ‘প্যানেল বসিয়ে কেউ যদি হিসাব করেন কত বছরে কত টাকার বিল সাশ্রয় হবে, তাহলে হবে না। এই প্যানেল মূলত সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দেবে।’
দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের নেট মিটারিং নির্দেশিকা প্রথম জারি করা হয় ২০১৮ সালে। পরবর্তীতে ২০২৩ ও ২০২৫ সালে নির্দেশিকা সংশোধন করে ক্ষুদ্র আবাসিক গ্রাহকদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া, সৌর সরঞ্জামের উচ্চ আমদানি শুল্ক এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগটি সফল হয়নি।
২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৮৪ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও ২ হাজার ৪৭৬টি নেট-মিটারড রুফটপ সিস্টেমের সম্মিলিত সক্ষমতা ছিল মাত্র ১১১ মেগাওয়াট।