তিন লাখ টাকা ঘিরে বিরোধ। সেই বিরোধের জেরে নিখোঁজ ব্যবসায়ী শেখ ওয়াসিম রনী (৪৭)। পরিবারের উৎকণ্ঠা আর স্বজনদের খোঁজাখুঁজির মধ্যেই তদন্তে নতুন মোড় নেয়। একপর্যায়ে পুলিশের সন্দেহের তালিকায় আসে তার বন্ধু মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর নাম। দীর্ঘ তল্লাশির পর রাজধানীর লালবাগের ৯ বি সি দাস স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ওয়াসিমের লাশ। হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখ পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায় লাশটি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তিন লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ওয়াসিমকে হত্যা করে লাশ গোপন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর ৯ নম্বর বি সি দাস স্ট্রিটের ওই ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় তল্লাশির পর শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে পলিথিন প্যাঁচানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহতের স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেখ ওয়াসিম রনী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যে ভবনের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় আটক মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর ইমিটেশন জুয়েলারির পাইকারি কারখানা ছিল বলে জানান ওয়াসিমের শ্যালক মুরাদ হোসেন।
মুরাদ হোসেন জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওয়াসিমের যোগাযোগ হয়। ওই দিন তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল বলে তারা জানতে পারেন। তার বড় বোনের স্বামীর সঙ্গে ওয়াসিমের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয়টিও তিনি জানতেন বলে জানান মুরাদ।
তিনি বলেন, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকেই ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি জানার পর পরিবারের সদস্যরা তাকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজতে শুরু করেন। একই সঙ্গে ওয়াসিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা।
একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্ত মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। মাসুমের স্ত্রী ওয়াসিমের বিষয়ে কোনো খোঁজ জানেন না বলে জানান। তিনি শুধু বলেন, ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন, পরে চলে গেছেন।
কোনো সন্ধান না পেয়ে একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিম নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্নভাবে ওয়াসিমের সন্ধান চালানো হয়।
মুরাদ হোসেন জানান, একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে- ওয়াসিমকে হত্যা করে একটি ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে ওই স্থানে অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের লাশ লুকিয়ে রাখতে আট বস্তা মাটি এনে বাসার পাশে তাকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, তার বোনের স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। এখন তার বোন ও পরিবারের কী হবে— এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, তিন লাখ টাকা নেওয়ার পর প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। পরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিহতের স্বজনদের আরও অভিযোগ, ওয়াসিমকে হত্যার পর তার হাত-পা বেঁধে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়েছিল। তবে তার শরীরে আঘাতের ধরন, মৃত্যুর কারণ এবং কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে—এসব বিষয়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় বসবাস করতেন শেখ ওয়াসিম রনী।
এদিকে অভিযুক্ত মাসুমের বোনের জামাইয়ের দাবি, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিম রনীর কাছ থেকে মাসুম তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে সুদ দেওয়ার কথা ছিল। পরে তিন লাখ টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসিমের সঙ্গে মাসুমের বিরোধ চলছিল বলে ধারণা করেন তিনি।
তিনি জানান, পুলিশের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে পাওনা টাকা চাইতে ওয়াসিম রনী মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি শুরু হলে মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুসি মারেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যান বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, পুলিশের কাছ থেকে পরে জানতে পারেন- ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার পর তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। ওই স্থানেই মাটি দিয়ে লাশটি চাপা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমকে বাসায় না পেয়ে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে ওয়াসিমের স্ত্রীর ভাই মো. মুরাদ হোসেনের মোবাইল ফোন থেকে মাসুমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তখন মাসুম জানান, তিনি ইস্কাটন এলাকায় আছেন। সেখানকার কাজ শেষ করে তাদের সঙ্গে দেখা করবেন বলেও জানান তিনি।
কিন্তু দীর্ঘ সময়েও মাসুম তাদের সঙ্গে দেখা না করায় ওয়াসিমের স্বজনরা তার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যেতে থাকেন। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মাসুম তাদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর তাকে সঙ্গে নিয়ে লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিমের নিখোঁজের বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরির আবেদন করা হয়। এ জিডির নম্বর ৪২৬, তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এজাহারে বলা হয়েছে, পরবর্তীতে থানা পুলিশের সহায়তায় ওয়াসিমের সন্ধান চালানো হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ মাসুমকে সন্দেহ করে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মাসুমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগ থানাধীন ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিসি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাসার পাঁচতলা ভবনে তল্লাশি চালানো হয়। ওই ভবনের নিচতলার খালি জায়গা থেকে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে পলিথিন প্যাঁচানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে লালবাগ থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আনুষঙ্গিক কাজ শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, মাসুম ওয়াসিমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। তিন মাসের মধ্যে ওই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেও মাসুম টাকা পরিশোধ করেননি।
এজাহারে বাদীপক্ষের অভিযোগ, পাওনা টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য ওয়াসিম মাসুমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে মাসুম পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওয়াসিমকে হত্যা করেন এবং তার লাশ গুম করেন।
এজাহারে ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পাওনা তিন লাখ টাকা পরিশোধ না করার বিরোধ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
এজাহারে আরও একটি ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সম্ভবত ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে ভোর ৪টা ৫ মিনিটের মধ্যে লালবাগ থানার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের ৮৭ নম্বর ফ্ল্যাট, ৪ নম্বর ভবনের সামনে খোলা মাঠে মারধর করে হত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে একই এজাহারের অন্য অংশে বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাসার নিচতলার খালি জায়গা থেকে হাত-পা বাঁধা ও মুখে পলিথিন প্যাঁচানো অবস্থায় ওয়াসিমের লাশ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। ফলে ঘটনাস্থল, সময় ও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিবরণ নিয়ে এজাহারে অসঙ্গতি রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে যুগান্তরকে জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর রনী নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
তিনি জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কিনা, হত্যার প্রকৃত কারণ ও বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
টাকা ও লেনদেনকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের কারণ কিনা জানতে চাইলে ডিসি তালেবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে মাসুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত রনীর সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তার বাসায় গেলে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রনীকে আঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে গলা টিপে হত্যা করা হয়। এরপর ওয়াসিমকে ওই অফিসের পেছনের একটি সরু গলিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর সঠিক সময় ও ধরন, ঘটনায় অন্য কারো সম্পৃক্ততা এবং লাশ গোপনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের পরই এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।