গাড়ির লংমার্চ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা গেলে সরকারই সবার আগে লংমার্চের আয়োজন করতো বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণকে অযথা উত্তেজিত না করে বিদ্যমান সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে দেশে গ্যাস এবং বিদ্যুতের কারণে জনগণ ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সচেতন। এ সমস্যা হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি।’
তিনি বলেন, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দুই পাশে থাকা প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করলেও বাংলাদেশের অংশে দীর্ঘ সময় গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়নি।
‘অনেকে বলে থাকে, বিশেষ কোনও দেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তারা যাতে নির্বিঘ্নে গ্যাস নিয়ে যেতে পারে, সেই জন্যই বাংলাদেশের অংশে বঙ্গোপসাগরে গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি’—বলেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ছিল বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। ফলে দেশকে জ্বালানি ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ায় তেল ও গ্যাস আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে দুটি এফএসআরইউর একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এবং সেটি গ্যাস সরবরাহে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এটা একটা মস্তবড় বিপদ যোগ করলো এই সমস্যার মধ্যে। এ কারণেই বর্তমানে গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য সমগ্র দেশের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছিলেন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই সমস্যা সমাধানে আমরা আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। অথচ আমরা দেখলাম একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংকটের সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। জনগণের সামনে বিদ্যমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরা সরকারি ও বিরোধী দলের প্রত্যেক সংসদ সদস্যের দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘এই সংসদের প্রতিটি সদস্য ডাজেন্ট ম্যাটার। সেটি বিরোধী দলের হোক, সেটি সরকারি দলের হোক—আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সঠিক চিত্র বা বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরা।’
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে উসকানিমূলক আচরণের মাধ্যমে মোকাবিলা না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের বিষয়টি মনে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন না করে সংকটকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হলে ‘পতিত, পরাজিত, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ চক্র লাভবান হবে’।
সরকার ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস বা বিদ্যুতের যে সমস্যা যাচ্ছে, সেই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবো।’
তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সরকার দেশ ও জাতিকে এই সমস্যা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হবে।’
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতদিন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিল। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু বিদ্যুতের গ্রাহক থাকবে না, উৎপাদকও হবে।’
‘সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা যদি আমরা ইনশাআল্লাহ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমরা শুধু গ্রাহক নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হবো’—বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই বর্তমান সরকারের এই আত্মবিশ্বাস এসেছে।’
বক্তব্যে বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, ‘দলটি যতবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, প্রতিবারই দেশকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘৭০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশকে খাদ্যে রফতানির দেশেও পরিণত করা হয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হয়েছিল।’
১৯৯১ সালে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার প্রসার এবং নারী শিক্ষায় বিপ্লব ঘটানোর কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার দাবি, সে সময় প্রায় দুই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।