কার্যক্রম চলাকালীন এজলাস ছেড়ে চলে যান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির আপিল বিভাগ। নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে উচ্চবাচ্যে জড়িয়ে তারা এজলাস ছাড়েন বলে জানা যায়। এ ঘটনার পুরো বিবরণ জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সোয়া ২টার দিকে নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিং করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে ইঙ্গিত করে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘উনি আইনজীবীদের স্বার্থে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন বলে দাবি করেছেন। আসলে এমন কোনো কথা আজকের মামলার প্রসিডিংয়ে (কার্যধারা) হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বিচারিক শৃঙ্খলা, সততা প্রাধান্য দেন প্রধান বিচারপতি। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা সিরিয়াসলি ডিল (গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন) করেন।’
এজলাস ত্যাগের বিবরণ ও ২০১৩ সালে একজন কাজি নিয়োগ থেকে শুরু হওয়া ঘটনা উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘যেখানে মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে। অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে নারী আইনজীবীকে আজ আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা। যে টাকা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন; মাহবুব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না।’
তিনি বলেন, “ওই মামলায় সকাল সোয়া ৯টার দিকে আদেশ হয়। আর এ ঘটনার (এজলাস ত্যাগ) অবতারণা হচ্ছে ১২টা ৩৫ মিনিটে। অন্য একটি মামলার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই প্রসঙ্গে (খরচা আরোপ) বললেন যে, ‘একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখে–শুনে একটা আদেশ দিয়েছি। আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ, ওনাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতোপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বললেন, আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) এটা বলবেন না।’”
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলে ফেলেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ বিষয়টি প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নেন। তিনি বলেন, ‘আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) কি এটা মিন করেন?’ মাহবুব উদ্দিন খোকন অনেকটা সেই একই কথা বলার যখন চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেন,‘আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে উনি (প্রধান বিচারপতি) উঠে (এজলাস থেকে) যান।”
এদিকে, প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ ও সেখানে কী ঘটেছিল। এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, “আপিল বিভাগের এক নম্বর আইটেমে থাকা মামলায় সকালে নারী আইনজীবীকে কস্ট (খরচা আরোপ) দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় পাঁচ লাখ টাকা। আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা ১৩ নম্বর মামলা (আইটেম) শেষ হওয়ার পর প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলা খুব একটা হচ্ছে না। আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাকে মাফ করে দেন। তখন উনি বললেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে?’ আমি তখন বললাম, ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে...বোঝাতে চেয়েছি। আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। তিনটা বেঞ্চ ছিল। এখন একটা বেঞ্চ।”
তিনি বলেন, ‘একটা মামলা স্টে হলে...সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার আদালতে স্টে করছে, তা হিয়ারিং করতে এক বছর লাগে। ওখানে কোনো মেনশন করা যায় না কেন? এ মামলাটা ওপরে ছিল (কজলিস্টে) নিচে গেলে কেন এবং যেহেতু একটা বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মামলা শুনানি করতে পারছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি চিন্তা করিনি যে উনি (প্রধান বিচারপতি) এত রিঅ্যাক্ট করবেন। ওনারা তো রাগ–অভিমানের ঊর্ধ্বে বিচার করার কথা। আর আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমার অবলিগেশন আছে ওনার কাছে আইনজীবীদের পক্ষে আবেদন করার।’