প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী (সচিব পদমর্যাদা) রাশেদ খান আজ এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী যে গাড়ি ব্যবহার করেছেন, সেটির মালিক মাদারীপুর সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম তুষার ভুঁইয়া এবং তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
পোস্টে তিনি লিখেন, “মন্ত্রীপাড়ায় নাহিদ ইসলামের বাড়িতে আলোচনার সময় নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী সব সময় বলতো আওয়ামীলীগ বাড়িঘর, ধনসম্পদ দখল করতে হবে। আজকে তার কিছুটা নমুনা পাওয়া গেলো! গতকাল আওয়ামীলীগ নেতার প্যারাডো গাড়ি করে লংড্রাইভ করেছে নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী। আওয়ামীলীগ নেতাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কারণে গাড়িটি উপহার দিয়েছে, নাকি আওয়ামীলীগের সম্পদ দখলের খায়েশ থেকে গাড়িটিও দখল করেছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
গতকালের লংমার্চের পিকনিক থেকে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে কেনো কোনো বক্তব্য ছিলো না তা বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ এই লংমার্চের উদ্দেশ্যই ছিলো শেখ হাসিনাকে ডিসেম্বরে ফিরিয়ে আনার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা। আর সেই লক্ষ্যে উস্কানিমূলক স্লোগান ও বহরে লাঠিসোঁটা নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিএনপি বা অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জামায়াতের পাতানো ফাঁদে পা দেয় নি। দেখা যাক, এবিষয়ে এনসিপি দলীয় কোন ব্যবস্থা নেয় কি না!”
দেখুন এখানে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা পেপার্স “আওয়ামী লীগের নেতার গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী?” ক্যাপশনে মোহাম্মদ সাফায়েত হোসেন নামে একজন এক্টিভিস্টের একই রকম বক্তব্য সম্বলিত একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে।

দেখুন এখানে।
বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের ফোরাম Bangladesh Centrist Activists Network-এর ফ্যাক্ট-চেক অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা ট্র্যাকিং ডিরেক্টর Md M Rashed ফেসবুকে এক পোস্টে একই দাবি করেন।
একই বা প্রায় একই বক্তব্য আরও কয়েকটি বিএনপিপন্থী ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়।
দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে।
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, বিরোধী দলের ছয় দফা দাবিতে আয়োজিত লং মার্চে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী যে গাড়িটি ব্যবহার করেন, তার মালিক মনিরুল হক ভুঁইয়া, যিনি তুষার ভুঁইয়া নামেও পরিচিত। তাকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করার পক্ষে দ্য ডিসেন্ট কোনো প্রমাণ পায়নি। বরং তিনি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাদারীপুর সদর থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এবং পরে ২০২৪ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
তুষার ভুঁইয়ার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, যিনি বাচ্চু ভুঁইয়া নামেও পরিচিত, ১৯৮৮ সালে মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসনে বিএনপির প্রার্থী হন। তিনি মাদারীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছেন।
দ্য ডিসেন্টের হাতে আসা বিভিন্ন ছবি ও অন্যান্য তথ্যেও তুষার ভুঁইয়াকে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়।

এছাড়াও, তুষার ভুঁইয়ার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময় তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পোস্ট করেছিলেন।
মনিরুল হক ভুঁইয়া দ্য ডিসেন্টকে বলেন, তাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে যে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, “আমাকে আওয়ামী লীগ বানানোর যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেটি হাস্যকর। আমি ফ্যাসিবাদী আমলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়েছি। বিএনপির রাজনীতি করেছি।”
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তার তোলা ছবির বিষয়ে তিনি বলেন, “উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় উপজেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে তৎকালীন মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ছবি তুলতে হয়েছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব ছবি দেখিয়ে আমাকে আওয়ামী লীগ বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, এটা হাস্যকর।”
এনসিপির মাদারীপুর জেলার যুগ্ম সমন্বয়ক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাদারীপুর জেলার সাবেক আহ্বায়ক মো. নিয়ামত উল্লাহও দ্য ডিসেন্টকে বলেন, তুষার ভুঁইয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।
তিনি বলেন, “তুষার ভুঁইয়া আওয়ামী লীগ নন। গণঅভ্যুত্থানের শুরু থেকেই তিনি আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন, এমনকি আর্থিক সহায়তাও করেছেন। তাকে অনলাইনে আওয়ামী লীগ হিসেবে উপস্থাপন করে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেটি সঠিক নয়।”