বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা নিতে ভারতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন কলকাতার হাসপাতালগুলোর মালিকরা। এ অবস্থায় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। এসব দল রোগী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করবে এবং হোটেল বুকিংয়ের বিষয়ে পরামর্শ দেবে। পাশাপাশি, রোগীরা যেন প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা অনুমোদন থাকা হাসপাতালে ভর্তি হন, সেটিও নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তাদের অনেকেই সীমান্তের ওপার থেকে আসা রোগীদের থাকার সমস্যা কমাতে আশপাশের হোটেল ও লজগুলোর সঙ্গে চুক্তিও করছে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় গণমাধ্যমটিতে প্রকাশিত প্রদিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ হাইকমিশনের জারি করা একটি পরামর্শের পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে কলকাতায় ভ্রমণকারীদের সব ধরনের বৈধ অনুমোদন থাকা নিরাপদ হোটেলে কক্ষ বুক করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি গেস্ট হাউসে ভয়াবহ আগুনে নয়জন নিহত হওয়ার পর বাজেট হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। এই ঘটনার পরই হাইকমিশন ওই পরামর্শ দেয়।
শহরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মনে করছে, বাংলাদেশের বড় একটি অংশের মানুষের পক্ষে এই পরামর্শ মেনে চলা কঠিন হবে। তাদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য সড়কপথে কলকাতায় আসেন এবং কলকাতা ও আশপাশে কম খরচের থাকার জায়গা খোঁজেন। ফলে তারা প্রায়ই সন্দেহজনক আবাসনে উঠতে বাধ্য হন।
প্রদিবেদনে বলা হয়, বিপি পোদ্দার হাসপাতালের কর্মকর্তাদের একটি দল আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশে যাবে। পাশাপাশি, দক্ষিণ কলকাতায় হাসপাতালটির কাছেই বাংলাদেশি রোগীদের জন্য নিজস্ব আবাসন সুবিধাও চালু করছে কর্তৃপক্ষ।
বিপি পোদ্দার হাসপাতালের গ্রুপ উপদেষ্টা সুপ্রিয় চক্রবর্তী বলেন, ‘রোগীদের চিকিৎসার যাত্রা আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে আমরা হাসপাতালের আশপাশে থাকার ব্যবস্থা করছি। রোগীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাসপাতালের পাশেই বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আলাদা আবাসন সুবিধা তৈরির কাজও চলছে। সেখানে নির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। খুব শিগগিরই এসব সুবিধা চালু হবে বলে আশা করছি।’
উডল্যান্ডস মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালও বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশী রোগীদের জন্য আলিপুর এলাকার একাধিক গেস্ট হাউস ও হোটেলের সঙ্গে চুক্তি করেছে হাসপাতালটি।
হাসপাতালটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব হসপিটালস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার (AHEI) সভাপতি রূপক বড়ুয়া বলেন, ‘নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা রোগীদের সচেতন করতে চাই। আগামী দুই সপ্তাহে আমাদের হাসপাতালে আসার কথা রয়েছে—এমন রোগীদের আলিপুর এলাকার গেস্ট হাউস ও হোটেলগুলোর একটি তালিকা পাঠাচ্ছি। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী, তারা যেন ভ্রমণের আগেই থাকার জায়গা বুক করতে পারেন, সেটিই এর উদ্দেশ্য। এরই মধ্যে কয়েকজন আমাদের সহায়তা চেয়েছেন, আবার কেউ কেউ নিজেরাই কক্ষ বুক করেছেন।’
রুবি জেনারেল হাসপাতালও এর আগে বাংলাদেশী রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল। এবার হাসপাতালটি সেখানে আসার পরিকল্পনা করা রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি আলাদা ডেস্ক চালু করছে।
হাসপাতালটির অপারেশন বিভাগের প্রধান জেনারেল ম্যানেজার সুভাষিস দত্ত বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি এবং হাসপাতালের আশপাশের থাকার জায়গাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করেছি। এগুলো নিরাপদ জায়গা এবং ভ্রমণের আগে রোগীদের কক্ষ বুক করতে আমরা সহায়তা করছি। সৌভাগ্যবশত, এই এলাকায় পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা রয়েছে।’
চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে মেডিকেল ভিসা প্রয়োজন। তবে বহির্বিভাগের (OPD) রোগীদের জন্য এটি প্রয়োজন হয় না।
জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে অল্প সময়ের মধ্যেই মেডিকেল ভিসা দেয়া হয়।
রূপক বড়ুয়া আরও বলেন, ‘তবে ওপিডিতে চিকিৎসা নেয়া রোগীদের অনেকের চিকিৎসা দীর্ঘ সময় ধরে চলে। এ সময় তাদের হোটেলে থাকতে হয়। আবার অনেকেই চিকিৎসার পাশাপাশি ভ্রমণও করেন।’
ডিসান হাসপাতালের ইন্টারন্যাশনাল সেল বিদেশি রোগীদের জন্য ‘উপযুক্ত আবাসনের’ ব্যবস্থা করা শুরু করেছে।
ডিসান হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সজল দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের এই পরামর্শের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগী ও ভ্রমণকারীদের আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা করার এবং গন্তব্যের কাছাকাছি নিরাপদ ও চালু হোটেল বেছে নেয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সতর্কতা তৈরি হতে পারে। তবে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য আসা প্রকৃত রোগীদের ক্ষেত্রে এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে আসা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি রোগী যেন নিরাপদ, সুবিধাজনক ও নির্বিঘ্ন অভিজ্ঞতা পান, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। নিরাপত্তাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোগীদের চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়ায় আমরা সবসময় তাদের পাশে থাকার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’