Image description

দেশের জ্বালানি সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। ২০০২ সাল থেকেই সবাই জানা ছিল, বাংলাদেশের সাশ্রয়ী জ্বালানির প্রধান উৎস—প্রাকৃতিক গ্যাস—২০৩০-৩১ সালের মধ্যে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আসন্ন এই সংকট মোকাবিলায় ধারাবাহিকভাবে বিগত সরকারগুলো আমদানিকৃত জ্বালানির সাহায্যে তাৎক্ষণিক সমাধানের দিকে ঝুঁকেছে।

জ্বালানি আমদানি সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীকে আর্থিকভাবে লাভবান করেছে ঠিকই। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে মনোযোগ না দিয়ে দিনের পর দিন এই আমদানিনির্ভরতার ফলে দেশের কোনো লাভ হয়নি। বরং বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ২০৩০-৩১ সালের চরম জ্বালানি সংকটের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে গেছে। রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র মাত্র কয়েক বছরের জন্য চালু থাকার কথা থাকলেও, তা চলেছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা দিয়ে আসছিলেন। দেশীয় জ্বালানি কাঠামোকে শক্তিশালী করতে তারা তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন: নিজস্ব কয়লার ব্যবহার, সক্রিয় অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কার ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো।

কিন্তু সরকার এসব সমাধানে জোর দেয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে প্রমাণিত ও সম্ভাব্য কয়লার মজুত রয়েছে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন থেকে ৭.৮ বিলিয়ন টন পর্যন্ত, যার বাজারমূল্য প্রায় ১.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ আজ কয়লা আমদানি করতেই দেশকে প্রতি বছর ১.১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। 

একইভাবে, বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও, দেশে সর্বশেষ বড় কোনো গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এরপর গ্যাস অনুসন্ধানে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ছিল একেবারেই অপ্রতুল এবং নেতৃত্বের ব্যর্থতায় ভরা।

গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পথ বেছে নেয়। এটিও ছিল আরেকটি তাৎক্ষণিক সমাধান, যা স্বল্পমেয়াদে কার্যকর। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যয়বহুল আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে দেশের বিপুল গ্যাসের চাহিদা মেটানো টেকসই নয়।

বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে জোরালো মত দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ বিগত প্রশাসনগুলো বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে খুব একটা আগ্রহ বা সাফল্য দেখায়নি।

এছাড়া গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে জানার পরও বিগত সরকারগুলো গ্যাস ব্যবহারের ওপর কোনো ঊর্ধ্বসীমা আরোপ করতে পারেনি। এমনকি বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের কোনো পরিকল্পনাও স্তবায়নেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে গ্যাসের চাহিদা কেবল বেড়েই চলেছে। সেই চাহিদা পূরণের কোনো বাস্তবসম্মত আশা এখন নেই।

এক দশক আগেও বাংলাদেশকে কেবল পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করতে হতো। এখন সরকারের আমদানিনির্ভর নীতির কারণে দেশকে সব ধরনের জ্বালানিই আমদানি করতে হচ্ছে।

গ্যাসে ভাসার স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা

১৯৯৮ সালে মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোকল যখন সিলেটে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে, তখন জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল এখনকার সক্ষমতার দশভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। তখন প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল বর্তমান মাত্রার তিন ভাগের এক ভাগ।

বিবিয়ানা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কিন্তু ইউনোকলের ধারণা ছিল, এই বিপুল গ্যাস ব্যবহারের মতো প্রস্তুতি বাংলাদেশের নেই। দ্রুত মুনাফা তোলার আশায় কোম্পানিটি তখন ভারতে একটি প্রস্তুত বাজার পেয়ে সেখানে গ্যাস রপ্তানি করতে চায়। বাংলাদেশ 'গ্যাসে ভাসছে' কিন্তু দেশে এর পর্যাপ্ত বাজার নেই—এমন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে ইউনোকল বেশ কয়েকটি থিংকট্যাংককে মাঠে নামায়। তাদের যুক্তি ছিল, বিবিয়ানার গ্যাস ভারতে রপ্তানি করে বাংলাদেশের উচিত কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ইউনোকল বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে বিবিয়ানা থেকে ভারতের দিল্লি পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করার কথা ছিল, যা বাংলাদেশের বর্তমান দৈনিক ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দুটি জাতীয় তেল ও গ্যাস কমিটি গঠন করে। একটি কমিটির দায়িত্ব ছিল দেশের মোট হাইড্রোকার্বন মজুত মূল্যায়ন করা, অপরটির কাজ ছিল বিদ্যমান গ্যাস সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়ে সুপারিশ করা। গ্যাস ব্যবহার কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক জ্বালানি সচিব আজিম উদ্দিন আহমেদ। আর গ্যাস সম্পদ মূল্যায়ন কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য ড. নূরউদ্দিন।

বাংলাদেশ 'গ্যাসে ভাসছে'—এমন দাবির সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পায়নি মজুত মূল্যায়ন কমিটি। অন্যদিকে অদূর ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহে সম্ভাব্য ঘাটতির কথা বিবেচনা করে গ্যাস রপ্তানির বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দেয় ব্যবহার কমিটি।

দুটি কমিটিই ইউনোকলের রপ্তানি পরিকল্পনায় পানি ঢেলে দেওয়ায় কোম্পানিটি শেষপর্যন্ত দেশের ভেতরেই গ্যাসক্ষেত্রটির উন্নয়ন ও গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৫ সালে ইউনোকলকে অধিগ্রহণ করে শেভরন।

এরপর শিগগিরই ভারতে ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস রপ্তানির বদলে কোম্পানিটি বাংলাদেশের জন্য ১ হাজার এমএমসিএফডি পর্যন্ত গ্যাস উৎপাদন শুরু করে—যা ছিল দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের অর্ধেক।

এই সময়কালেই সরকারি চুক্তির আওতায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি উন্নয়নের প্রস্তাব দেয় ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জি। খনিতে বিপুল মজুত থাকলেও এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশকে সামান্য রয়্যালটি দিয়ে কয়লা রপ্তানি করতে চেয়েছিল, যা ছিল দেশের স্বার্থের পরিপন্থি। ২০০৬ সালে উন্মুক্ত কয়লা খনি ও এশিয়া এনার্জির এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে, যা শেষপর্যন্ত বিশাল বিক্ষোভে রূপ নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে পাঁচজন নিহত হন, সহিংস হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। সেই থেকে প্রকল্পটি থমকে রয়েছে। 

পরিকল্পনা স্থগিত

২০০৮ সালের শেষের দিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের প্রসার ও জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। পরের বছরগুলোতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি সই করে বাংলাদেশ; নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করে।

তারপরও দেশের সমস্ত সার কারখানা ও বেশিরভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়। সে সময় বিবিয়ানা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ হওয়া সত্ত্বেও সরকার নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া সীমিত করে ফেলে।

আসন্ন তীব্র গ্যাস সংকটের বিষয়টি অনুধাবন করে কুতুবদিয়ায় একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রাথমিকভাবে কথা ছিল, টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে সহায়তা দেবে—সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।

এসব তাৎক্ষণিক সমাধান দেশকে দ্রুত স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে সরকার হাত গুটিয়ে বসে ছিল।

২০১২ সাল নাগাদ সরকার ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি 'কোল পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট মাস্টার প্ল্যান'-এর খসড়া প্রণয়ন করে।

এ পরিকল্পনায় দেশীয় কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়, যাতে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির অন্তত অর্ধেক স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা যায়। এতে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, ২০২০ সাল নাগাদ দেশীয় কয়লা দিয়ে ২৫ শতাংশ, প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে ২০ শতাংশ এবং পানিবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে ৫ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা মেটানো যাবে।

এই লক্ষ্য অর্জনে মহাপরিকল্পনাটিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। এসবের মধ্যে ছিল দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত পুনর্মূল্যায়ন, উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ওয়ার্কওভার (সংস্কারকাজ) পরিচালনা এবং নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ। পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে একটি উন্মুক্ত খনি বাস্তবায়ন ও এর মূল্যায়নের পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু পরিবেশগত ঝুঁকি ও কৃষিজমির ক্ষতির কারণ দেখিয়ে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ কোনো কয়লা খনি উন্নয়ন করবে না।

এ ঘোষণার ফলে থমকে থাকা ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিল হয়ে যায় এবং কয়লাভিত্তিক মহাপরিকল্পনাটিও প্রাসঙ্গিকতা হারায়।

তবে শেখ হাসিনার এই নীতি রামপাল, পায়রা, মাতারবাড়ী ও বাঁশখালীতে নির্মিত নতুন চারটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য কয়লা আমদানি থেকে বাংলাদেশকে বিরত রাখতে পারেনি।

বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করে, যার জন্য বার্ষিক ব্যয় হয় ১.১৯ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলার।

এশিয়া এনার্জির সেই বিতর্কিত প্রস্তাবে বছরে ১৫–১৬ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সরকার চাইলে বাংলাদেশের অনুকূলে আরও সুবিধাজনক শর্তে চুক্তিটি নিয়ে নতুন করে দরকষাকষি করতে পারত, অথবা চুক্তিটি বাতিল করে নতুন কোনো ডেভেলপার নিয়োগ দিতে পারত। কিন্তু তার বদলে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।

গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানে হাতছাড়া হওয়া সুযোগ

২০০৮ সালে মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কনোকোফিলিপস গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকার লাভ করে। ২০১১ সালে তারা পেট্রোবাংলার সঙ্গে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সই করে। বঙ্গোপসাগরের গভীরে ব্যাপক জরিপ চালানোর পর কোম্পানিটি এমন একটি সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পায়, যেখানে ৫ থেকে ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত থাকতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়। এই মজুতের পরিমাণ বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের প্রায় সমান।

চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্যাসক্ষেত্রের মজুত নিশ্চিত করা ও এর উন্নয়নের জন্য কনোকোফিলিপস ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। তবে এর শর্ত হিসেবে তারা ২০০৮ সালের পিএসসি চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার অনুরোধ জানায়। 

কোম্পানিটির যুক্তি ছিল, পানির দেড় কিলোমিটার গভীরে কূপ খননের জন্য যে বিশাল আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি নিতে হবে, ২০০৮ সালের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তা লাভজনক নয়। তাই তারা গ্যাসের সর্বোচ্চ দামের সীমা বাড়িয়ে প্রতি এমএমসিএফডি ৬.৫০ ডলারে নির্ধারণের অনুরোধ করে (যা ২০১২ সালের হালনাগাদ করা মডেল পিএসসিতেও উল্লেখ ছিল)। ২০০৮ সালের মূল চুক্তিতে এই দাম নির্ধারিত ছিল ৪.৪০ ডলার।

এর পাশাপাশি গ্যাস সঞ্চালন ও পাইপলাইন নির্মাণের জন্য কনোকোফিলিপস একটি পৃথক চুক্তির দাবি জানায়। এসব শর্ত মানলে, কোম্পানিটির ভাগের গ্যাসের দাম কার্যত দাঁড়াত প্রতি এমএমসিএফডি ৮.৫০ ডলার পর্যন্ত। তাদের এই প্রস্তাবিত দাম ছিল শেভরনের পিএসসির আওতায় বিবিয়ানা থেকে উৎপাদিত গ্যাসের দামের দ্বিগুণেরও বেশি।

যেকোনো পিএসসির একটি ভালো দিক হলো, এ চুক্তির আওতায় উৎপাদিত গ্যাসের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশ বিনামূল্যে পায়। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের এই বিনামূল্যে পাওয়া অংশের পরিমাণ কম (২০ শতাংশ) থাকে। কারণ, চুক্তির শর্তানুসারে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং তারা তাদের নিজস্ব ভাগও পায়। তবে বিনিয়োগের খরচ পুরোপুরি উঠে আসার পর বাংলাদেশের হিস্যার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো পিএসসি অপারেটর যদি ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদন করে, তবে বাংলাদেশ শুরু থেকেই বিনামূল্যে ২০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাবে।

প্রস্তাবিত এই সংশোধনীগুলো অনেক বেশি ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে মার্কিন কোম্পানিটি বাংলাদেশ ত্যাগ করে। এটিই ছিল দেশের গভীর সমুদ্রের জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগের একমাত্র প্রচেষ্টা।

প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে বাংলাদেশ চাইলে মার্কিন কোম্পানিটির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারত। সেটি সম্ভব হলে আজ দেশের জ্বালানি চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। তাছাড়া তাদের প্রস্তাবিত দাম এখনো আমদানি করা এলএনজির চড়া দামের চেয়ে কমই ছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে বছরে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে, যা ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সদিচ্ছার অভাব

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদন করে। এতে ২০১৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৫ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই লক্ষ্যমাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সদ্য ক্ষমতা গ্রহণ করা আওয়ামী লীগ সরকার সোলার প্যানেলের ওপর থেকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করে নেয়।

তবে শিগগিরই প্রশাসনের মনোযোগ ঘুরে যায় তাৎক্ষণিক সমাধানের দিকে। লোডশেডিং দ্রুত কমাতে তারা তেলভিত্তিক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন শুরু করে। পাশাপাশি মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প হিসেবে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রধান কৌশল হয়ে ওঠে আমদানিকৃত জ্বালানি, যেমন কয়লা, এলএনজি ও পারমাণবিক জ্বালানিকেন্দ্রিক। 

এর ফলে ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের মাত্র ২.৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা সম্ভব, যা নির্ধারিত ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। পরে এই লক্ষ্যমাত্রা পরিবর্তন করে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষের দিকে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি বড় উদ্যোগ নেয়। এর আওতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য লেটার অভ ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত এসব এলওআই বাতিল করে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া, বিতর্কিত আইনের আওতায় এগুলো দেওয়া হয়েছিল। এরপর ইউনূস প্রশাসন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করে, যদিও এতে খুব একটা সফলতা আসেনি।

প্রকল্পগুলো বাতিলের এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকল্পগুলো নিয়ে নতুন করে দরকষাকষি ও পুনর্মূল্যায়ন করা যেত, কারণ ডেভেলপার কোম্পানিগুলো এরইমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগ করে ফেলেছিল।

এই ৩১টি বিদ্যুৎ প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়ন হলে তা ৮২০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির বিকল্প হতে পারত এবং সরাসরি ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করত। প্রকল্পগুলো বাতিল না হলে এখন অন্তত এর অর্ধেক চালু থাকত, যা দেশের জ্বালানি খাতের ওপর চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে দিত।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিনা দরপত্রে হওয়ার কারণে নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো বাতিল করা হলেও, ইউনূস সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) আওতায় জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য কেনা অব্যাহত রেখেছে। ডিপিএম হলো উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে একক উৎস থেকে পণ্য কেনার অপ্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া।

বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর বাতিল হওয়া সেই ৩১টি প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এপ্রিলে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রকল্পগুলো ফের চালু করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে সরকার সেগুলো পর্যালোচনা করবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্প ফের চালু করা হয়নি।

সামনের পথ

আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোই এখন এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র টেকসই পথ। এটি কেবল আকাশচুম্বী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্যই জরুরি নয়, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতেও অপরিহার্য।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে নবায়নণযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানোর গুরুত্ব সম্পর্কে বিএনপি সরকার অবগত বলেই মনে হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য আকর্ষণীয় প্রণোদনারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি ডেনমার্কের একটি ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর উইন্ড ফার্ম নির্মাণের প্রস্তাব ভালো সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে—সৌরশক্তির মতো সীমাবদ্ধতা না থাকায়—এ কেন্দ্র থেকে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাবে। এটি সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি কমাতে ভূমিকা রাখবে।

২০৩০-৩১ সালের পরও দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন বজায় রাখতে সরকারকে স্থলভাগ ও গভীর সমুদ্র—উভয় অঞ্চলেই গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমানে নীতিগত গুরুত্ব মূলত এলএনজি টার্মিনাল সম্প্রসারণ করে আমদানি বাড়ানোর দিকেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ক্রমাগত এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে যাওয়া আর্থিকভাবে টেকসই নয়। সরকারের উচিত এলএনজি আমদানি ও গ্যাস ব্যবহারের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া, যাতে শিল্পকারখানাগুলো বিকল্প প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

সর্বোপরি, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজস্ব কয়লা মজুতের একটি অংশ উত্তোলনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে বাংলাদেশকে।